অল্প সময়ের ব্যবধানে প্রথম সারির প্রায় সব নেতার মৃত্যুতে তেহরানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছিল। সে শূন্যতা অনেকটাই পূরণ করেছিলেন ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান আলী লারিজানি।
মঙ্গলবার ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন তিনি। একই সঙ্গে নিহত হন দেশটির বাসিজ বাহিনীর প্রধান গোলামরেজা সোলেইমানি ও জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধান আলীরেজা বায়েত। এছাড়া গতকাল ইসরায়েল ইরানের গোয়েন্দাবিষয়ক মন্ত্রী ইসমাইল খতিবকেও হত্যার দাবি করেছে। ধারাবাহিকভাবে শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে নেতৃত্বের এ শূন্যতা ইরানকে নেতৃত্ব সংকটে ফেলবে, নাকি দেশটি তার প্রতিষ্ঠিত কাঠামোর ভেতর থেকেই নতুন ভারসাম্য খুঁজে নেবে?
বিশ্লেষকরা বলছেন, লারিজানিসহ দেশটির প্রাগম্যাটিক বা বাস্তববাদী নেতৃত্বের বড় অংশই মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন। ফলে কেবল নেতৃত্বের শূন্যতাই তৈরি হয়নি, বরং যুদ্ধের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। যারা পশ্চিমা দেশ, উপসাগরীয় প্রতিবেশী কিংবা আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারতেন, তাদের বেশির ভাগই বেঁচে নেই। এর ফলে ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ কাঠামো আরো বেশি সামরিকীকরণ ও কট্টরপন্থী নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ঐতিহ্যগতভাবে ব্যক্তিনির্ভর নয়। এটি সম্পূর্ণভাবে কোনো একক নেতার ওপর দাঁড়িয়ে নেই। ইসলামী প্রজাতন্ত্রের কাঠামোতে সর্বোচ্চ নেতার পাশাপাশি রেভল্যুশনারি গার্ড, সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল, ধর্মীয় পরিষদের মতো একাধিক শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান সমান্তরালভাবে ক্ষমতার ভার বহন করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো এ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং কৌশলগত দিকনির্দেশনা অনেকটাই নির্ভর করে নির্দিষ্ট কিছু অভিজ্ঞ ব্যক্তির ওপর, যারা একই সঙ্গে রাজনৈতিক, সামরিক এবং কূটনৈতিক পরিসরে কাজ করতে সক্ষম। বলা হয়ে থাকে আলী খামেনির মৃত্যুর পর আলী লারিজানি ছিলেন ঠিক তেমনই একজন।
কয়েক দশক ধরে আলী লারিজানি ইরানের ক্ষমতা কাঠামোর শান্ত, সংযত ও বাস্তববাদী নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু ইসরায়েলি হামলা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি এবং ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর নিহত হওয়ার পর বদলে যায় ৬৭ বছর বয়সী এ নেতার ভাষা ও ভঙ্গি। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে হাজির হয়ে তিনি জ্বালাময়ী বক্তব্য দেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও একই কড়া ভাষা ব্যবহার করেন লারিজানি।
লারিজানি সামরিক কমান্ডার না হয়েও ইরানের নিরাপত্তা ও কৌশলগত সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে ছিলেন। তিনি এমন এক সেতুবন্ধকারী, যিনি কঠোর মতাদর্শিক অবস্থান এবং বাস্তববাদী কূটনীতির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে পারতেন। তার উপস্থিতি ইরানের ভেতরে বিভিন্ন ক্ষমতা কেন্দ্রের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখতে সাহায্য করত। ফলে তার মৃত্যু কেবল একটি পদ শূন্য হওয়া নয়, বরং একটি ‘সংযোগ বিন্দু’ ভেঙে পড়া। এ শূন্যতা তাৎক্ষণিকভাবে পূরণ করা কঠিন, কারণ একই ধরনের অভিজ্ঞতা, গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রভাব এক ব্যক্তির মধ্যে খুঁজে পাওয়া সহজ নয়।
আলী খামেনির মৃত্যুর পর মোজতবা খামেনি নতুন সর্বোচ্চ নেতা হলেও তাকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। এ অবস্থায় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব কার্যত ভাগ হয়ে পড়েছে একাধিক কেন্দ্রের মধ্যে। প্রেসিডেন্ট মাদু পেজেশকিয়ান, বিচার বিভাগের প্রধান এবং ধর্মীয় নেতৃত্ব মিলিয়ে একটি অন্তর্বর্তী কাঠামো তৈরি হয়েছে। কিন্তু এ ধরনের বহুমাত্রিক নেতৃত্বে একটি ঝুঁকি থাকে—সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব, দ্বিধা এবং কখনো কখনো পারস্পরিক প্রতিযোগিতা। যুদ্ধের মতো সংকটময় সময়ে এটি রাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের দুর্বলতা তৈরি করতে পারে।
এছাড়া শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুর কারণে ক্ষমতা ধীরে ধীরে সামরিক কাঠামোর দিকে সরে যাচ্ছে। দেশটির প্রেসিডেন্টের সাম্প্রতিক মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, শীর্ষ নেতৃত্ব অকার্যকর হয়ে পড়লে সশস্ত্র বাহিনীকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ দেয়া হয়েছে। এর অর্থ ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং অন্যান্য সামরিক ইউনিট এখন আরো বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠছে, যা যুদ্ধকে আরো অনিশ্চিত ও বিস্তৃত করে তুলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, লারিজানি ছিলেন এমন একজন, যিনি একদিকে কঠোর অবস্থান বজায় রাখলেও অন্যদিকে কূটনৈতিক যোগাযোগের পথ খোলা রাখতেন। তার অনুপস্থিতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য ক্রমেই কঠোরপন্থীদের দিকে ঝুঁকছে।
এ পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে কূটনৈতিক ক্ষেত্রে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের যে সীমিত যোগাযোগ ছিল, তা অনেকটাই নির্ভর করত এমন ব্যক্তিদের ওপর, যারা অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা কাঠামোর ভেতরে গ্রহণযোগ্য এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কথোপকথনে সক্ষম। লারিজানি ছিলেন সেই ধরনের বিরল ব্যক্তিদের একজন। তার অনুপস্থিতিতে এখন প্রশ্ন উঠছে তেহরানের সঙ্গে কথা বলার মতো ‘বিশ্বাসযোগ্য মুখ’ কে? দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এখনো দায়িত্বে থাকলেও তার রাজনৈতিক অবস্থান কতটা শক্তিশালী থাকবে, তা অনিশ্চিত।
চ্যাথাম হাউজের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিলের ভাষায়, লারিজানি ছিলেন এমন একজন ভেতরের মানুষ, যিনি যুদ্ধকালীন কৌশল নির্ধারণ থেকে শুরু করে প্রতিদিনের রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল এবং অতীতে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের নেতাদের সঙ্গেও তার যোগাযোগ ছিল। ভাকিলের মতে, তিনি এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোগবিন্দু ছিলেন, যিনি থাকলে সম্ভাব্য আলোচনা প্রক্রিয়া সামলাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারতেন।
তবে এটাও সত্য, ইরানের রাষ্ট্র ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে সংকট মোকাবেলার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা—সবকিছুর মধ্য দিয়েই দেশটি টিকে থেকেছে। ফলে শুধু কয়েকজন নেতার মৃত্যুতে রাষ্ট্রটি ভেঙে পড়বে—এমনটি বলা অতিরঞ্জন হবে।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে লারিজানির স্থলাভিষিক্ত কে হবেন। যুদ্ধ যত এগোচ্ছে, এ পদটির গুরুত্ব ততই বাড়ছে। যদি ক্ষমতার ভারসাম্য আরো বেশি কট্টরপন্থীদের দিকে ঝুঁকে থাকে, তাহলে খুব সম্ভব তাদেরই কাউকে এ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসানো হবে। তাৎক্ষণিকভাবে লারিজানির মৃত্যুর ফলে বর্তমান ক্ষমতা কাঠামোর ভেতরে পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মাদ বাকের ক্বালিবাফের প্রভাব বাড়তে পারে। তিনি ইরানের পুলিশ বাহিনী ও ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সাবেক কমান্ডার হিসেবে পরিচিত। ক্বালিবাফ দীর্ঘদিন ধরেই আইআরজিসির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত এবং ইরানের মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর কাছে তিনি এমন একজন হিসেবে পরিচিত, যিনি বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দমনমূলক অবস্থানের পক্ষে ছিলেন। মোজতবা খামেনিকে উত্তরসূরি হিসেবে প্রতিষ্ঠার পক্ষে তিনি জোর ভূমিকা রেখেছিলেন। শীর্ষ পর্যায়ে এভাবে কঠোরপন্থীদের প্রভাব আরো দৃঢ় হলে তুলনামূলকভাবে প্রাগম্যাটিক বা কূটনৈতিক ধাঁচের নেতাদের অবস্থান নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রজেক্টের পরিচালক আলী ভায়েজের ভাষায়, লারিজানির অনুপস্থিতিতে তেহরান এমন একজন অভ্যন্তরীণ ব্যক্তিকে হারাল, যিনি যুদ্ধক্ষেত্র ও রাজনীতির মধ্যে সংযোগ তৈরি করতে পারতেন। তার মতে, এর ফল শুধু দুর্বলতা নয়; বরং এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি হওয়া, যা আরো কঠোর ও বিপজ্জনক।
এদিকে লারিজানি হত্যার প্রতিশোধ নিতে আরো কঠোর হামলা চালানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। গতকাল ইসরায়েলসহ একাধিক দেশে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল ইরান থেকে দেশটিতে ১৩টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ২৭টি ড্রোন ছোড়া হয়। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আমিরাতের ওপর মোট ৩২৭টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ১৫টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১ হাজার ৬৯৯টি ড্রোন হামলা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এছাড়া হামলার ঘটনা ঘটেছে সৌদি আরব ও কাতারেও।
এছাড়া গতকাল ইসরায়েলের তেল আবিবসহ মধ্যাঞ্চলে ক্লাস্টার ওয়ারহেডযুক্ত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় তেহরান। গুশ দান এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং জেরুজালেম, রামাত গান ও বেনি ব্রাকসহ বিভিন্ন স্থানে ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। এসব হামলায় অন্তত দুজন নিহত ও কয়েকজন আহত হয়েছেন। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, নিরাপত্তাপ্রধান আলী লারিজানির হত্যার প্রতিশোধ হিসেবেই এ হামলা চালানো হয়েছে।
ইসরায়েলও ইরানের ভেতরে ধারাবাহিকভাবে লক্ষ্যভিত্তিক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। গতকাল দক্ষিণ ইরানের বুশেহর প্রদেশে বিশ্বের বৃহত্তম গ্যাস ক্ষেত্র সাউথ পার্সের একটি পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনাতেও হামলা চালানো হয়, যাতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সাউথ পার্স গ্যাস ক্ষেত্রে হামলা ইরানের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রটি শুধু ইরানের নয়, কাতারের সঙ্গেও যৌথভাবে যুক্ত বিশ্বের বৃহত্তম গ্যাস ক্ষেত্র। এর উৎপাদন ব্যাহত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও প্রভাব পড়তে পারে।
ইরানের বাইরে লেবাননেও হামলা জোরদার করেছে ইসরায়েল। রাজধানী বৈরুতের কেন্দ্রস্থলে বিমান হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত ও ৪১ জন আহত হয়েছেন। পাশাপাশি দক্ষিণ লেবাননে স্থল অভিযান এবং দেশটির বিভিন্ন স্থানে একাধিক বিমান হামলা চালানো হয়েছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, এখন থেকে যেকোনো জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর জন্য সেনাবাহিনীকে সরাসরি অনুমতি দেয়া হয়েছে। নতুন করে রাজনৈতিক অনুমোদনের প্রয়োজন হবে না।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক সমাধানের জন্য মধ্যস্থতা চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে চীন। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেন, এ যুদ্ধ কখনো হওয়া উচিত ছিল না। আর এটি চালিয়ে যাওয়ার কোনো কারণ নেই।
