তলানিতে নেমে আসা জন্মহার টেনে তুলতে নতুন কৌশল নিয়েছে চীন সরকার। গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে দেশটিতে কনডমসহ সব ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর ওপর ১৩ শতাংশ বিক্রয় কর কার্যকর করা হয়েছে। অর্থাৎ বেড়েছে। বিপরীতে শিশুর যত্ন, বিবাহসংক্রান্ত সেবা ও বয়স্কদের পরিচর্যাকে ভ্যাটমুক্ত ঘোষণা করেছে বেইজিং।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন টানা তিন বছর ধরে জনসংখ্যা হ্রাসের সংকটে ভুগছে। ২০২৪ সালে দেশটিতে জন্ম নিয়েছে মাত্র ৯৫ লাখ ৪০ হাজার শিশু, যা গত এক দশকের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই জনসংখ্যা সংকট মোকাবিলায় কর ব্যবস্থায় এমন পরিবর্তন এনেছে চীন।
নতুন কর সংস্কার অনুযায়ী, কনডম, জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি ও সংশ্লিষ্ট ডিভাইসের ওপর আগে করছাড় থাকলেও এখন থেকে ১৩ শতাংশ ভ্যাট দিতে হবে। অন্যদিকে শিশুযত্ন কেন্দ্র, কিন্ডারগার্টেন এবং বয়স্কদের সেবাখাতকে পুরোপুরি করমুক্ত করা হয়েছে।
সন্তান জন্মদানে উৎসাহ দিতে মাতৃত্বকালীন ছুটি বাড়ানো, দম্পতিদের নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়ার মতো উদ্যোগও নিয়েছে সরকার।
তবে এই সিদ্ধান্ত ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। অনেকেই এটিকে উপহাস হিসেবে দেখছেন। সিয়ানের বাসিন্দা রোজি ঝাও বলেন, কনডমের দাম বাড়িয়ে জন্মহার বাড়ানো সম্ভব নয়। বরং এতে অপরিকল্পিত গর্ভধারণ ও এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
হেনান প্রদেশের ৩৬ বছর বয়সী বাসিন্দা ড্যানিয়েল লুও বলেন, তাঁর একটি সন্তান আছে এবং আর সন্তান নেওয়ার ইচ্ছা নেই। তাঁর মতে, কনডমের দাম কিছুটা বাড়লেও এতে মানুষের আচরণ বদলাবে না। তিনি বলেন, এক বাক্স কনডমে পাঁচ থেকে ২০ ইউয়ান বেশি লাগতে পারে, যা বছরে কয়েক শ ইউয়ানের বেশি নয়।
তবে রোজি ঝাও মনে করেন, শিক্ষার্থী বা আর্থিক সংকটে থাকা মানুষ প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তাঁর আশঙ্কা, এটিই হতে পারে এই নীতির সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিণতি।
নীতিটির উদ্দেশ্য নিয়েও বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। উইসকনসিন ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংখ্যাবিদ ই ফুশিয়ান বলেন, কনডমে কর বাড়ালে জন্মহার বাড়বে—এমন ধারণা অতিরঞ্জিত। তাঁর মতে, আবাসন খাতের মন্দা ও বাড়তে থাকা জাতীয় ঋণের চাপ সামলাতে বেইজিং কর আদায়ের নতুন পথ খুঁজছে।
এদিকে জন্মহার বাড়াতে সরকারের মরিয়া প্রচেষ্টা ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ইউনানসহ কয়েকটি প্রদেশে সরকারি কর্মকর্তাদের নারীদের ফোন করে ঋতুচক্র ও সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা জানতে চাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের বিশেষজ্ঞ হেনরিয়েটা লেভিন বলেন, মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ উল্টো ফল দিতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, চীনে একটি সন্তান বড় করা বিশ্বের মধ্যে অন্যতম ব্যয়বহুল। শিক্ষা খাতে তীব্র প্রতিযোগিতা, আবাসন সংকট ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কারণে তরুণেরা সন্তান নিতে অনাগ্রহী। পাশাপাশি মানসিক চাপ, একাকিত্ব ও দায়বদ্ধতার ভয়ও বড় ভূমিকা রাখছে।
ড্যানিয়েল লুও বলেন, আজকের তরুণ প্রজন্ম আগের চেয়ে অনেক বেশি চাপে রয়েছে। বস্তুগতভাবে জীবন সহজ হলেও সামাজিক প্রত্যাশার চাপ বেড়েছে। তাঁর মতে, অনলাইন জীবনই অনেকের কাছে সহজ ও স্বস্তিদায়ক হয়ে উঠেছে।
