অতিরিক্ত ওজনের কারণ, ঝুঁকি ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা

- Advertisements -
ডা. মো. তালহা চৌধুরী: বর্তমানে অতিরিক্ত ওজন ও স্থূূলতা শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি একটি বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে শিশু থেকে বয়স্ক- সব বয়সী মানুষের মধ্যে এর হার বাড়ছে। অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, কম শারীরিক পরিশ্রম এবং নগরায়ণের প্রভাবে এ প্রবণতা আরও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। অতিরিক্ত ওজন নির্ণয়ের প্রচলিত পদ্ধতি হলো- দেহ ভর সূচক বা বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই), যা হিসাব করা হয়- ওজনকে (কেজি) উচ্চতার (মিটার) বর্গ দিয়ে ভাগ করে। বিএমআই ১৮.৫ থেকে ২৪.৯ হলে স্বাভাবিক, ২৫ থেকে ২৯.৯ হলে অতিরিক্ত ওজন এবং ৩০ বা তার বেশি হলে স্থূলতা ধরা হয়। তবে এশীয় জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে ২৩ বা তার বেশি বিএমআই হলেই ঝুঁকি শুরু হতে পারে, তাই এ পর্যায় থেকেই সতর্কতা প্রয়োজন।

অতিরিক্ত ওজন বাড়ার পেছনে নানা কারণ রয়েছে। খাদ্যাভ্যাসজনিত কারণে অতিরিক্ত ক্যালোরিযুক্ত খাবার, যেমন- ফাস্টফুড, বেকারি পণ্য ও কোমল পানীয় গ্রহণ, রাতের বেলা ভারী খাবার খাওয়া এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার ও ক্ষতিকর চর্বি গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, যেমন- দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা, মোবাইল বা টিভির সামনে সময় কাটানো এবং নিয়মিত ব্যায়ামের অভাবও ওজন বৃদ্ধির বড় কারণ।

কিছু শারীরিক ও হরমোনজনিত সমস্যা, যেমন- থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি, পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম এবং কিছু ওষুধের (স্টেরয়েড বা বিষণ্নতা-প্রতিরোধী ওষুধ) প্রভাবেও ওজন বাড়তে পারে। মানসিক চাপের কারণে অতিরিক্ত খাওয়া, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যগ্রহণও এর জন্য দায়ী। পাশাপাশি বংশগত ও পারিবারিক প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অতিরিক্ত ওজন শরীরের প্রায় সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রভাবিত করে এবং নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।

বিপাকীয় সমস্যার মধ্যে টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং রক্তে চর্বি বৃদ্ধির সমস্যা দেখা দেয়। হৃদরোগের ঝুঁকির মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক উল্লেখযোগ্য। লিভার ও হজমতন্ত্রে চর্বিযুক্ত লিভার রোগ এবং গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা হতে পারে। হরমোন ও প্রজনন ব্যবস্থায় বন্ধ্যত্ব ও মাসিকের অনিয়ম দেখা দিতে পারে। অস্থি ও জয়েন্টে হাঁটু ও কোমরের ব্যথা এবং অস্টিওআর্থ্রাইটিস হতে পারে। মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া, বিষণ্নতা ও উদ্বেগ দেখা দিতে পারে। অতিরিক্ত ওজন নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি।

Advertisements

খাদ্য পরিকল্পনায় দৈনিক ক্যালোরি ৫০০ থেকে ৭৫০ কিলোক্যালোরি কমানো যেতে পারে। প্লেট পদ্ধতি অনুসরণ করে অর্ধেক সবজি, এক-চতুর্থাংশ প্রোটিন (মাছ, ডাল, ডিম) এবং এক-চতুর্থাংশ শর্করা (ভাত বা রুটি) রাখা উচিত। প্রতিদিন চিনি ২৫ গ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা এবং ২-৩ লিটার পানি পান করা প্রয়োজন। কোমল পানীয়, ভাজাপোড়া ও অতিরিক্ত লবণ এড়িয়ে চলা উচিত। শারীরিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে সপ্তাহে অন্তত ১৫০-৩০০ মিনিট মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম করা প্রয়োজন। যেমন- দ্রুত হাঁটা, দৌড়ানো বা সাইকেল চালানো। পাশাপাশি সপ্তাহে অন্তত দুদিন শক্তি বৃদ্ধির ব্যায়াম করা উপকারী।

আচরণগত পরিবর্তনের মধ্যে খাদ্যতালিকা লিখে রাখা, ছোট প্লেটে খাওয়া, ধীরে ধীরে খাওয়া, পর্দার সামনে সময় কমানো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। চিকিৎসার ক্ষেত্রে, যাদের বিএমআই ২৭ বা তার বেশি এবং সঙ্গে অন্য রোগ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ওষুধ বিবেচনা করা যেতে পারে। বিএমআই ৩৫ বা তার বেশি হলে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ওজন কমানোর পদ্ধতি বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ ও ফলোআপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

Advertisements

লেখক : কনসালট্যান্ট, ফ্যামিলি মেডিসিন

চেম্বার : আলোক হেলথকেয়ার, মিরপুর-১০, ঢাকা

The short URL of the present article is: https://www.nirapadnews.com/nrs7
Notify of
guest
0 মন্তব্য
সবচেয়ে পুরাতন
সবচেয়ে নতুন Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Advertisements
সর্বশেষ
- Advertisements -
এ বিভাগে আরো দেখুন