রক্তাক্ত ঈদযাত্রা: সড়কে মৃত্যু মিছিল থামবে কবে

- Advertisements -

এস এম আজাদ হোসেন: বাংলাদেশে ঈদ মানেই ঘরমুখো মানুষের ঢল,আনন্দের প্রত্যাশা,পরিবারে ফিরে যাওয়ার উচ্ছ্বাস। কিন্তু প্রতি বছরই এই আনন্দযাত্রা রূপ নেয় এক নির্মম বাস্তবতায়-সড়কে মৃত্যু,আহতের আর্তনাদ, আর অগণিত পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি। চলতি বছরের ঈদযাত্রাও তার ব্যতিক্রম নয়; বরং আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।

সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ১৪ থেকে ২৮ মার্চ-মাত্র ১৫ দিনে দেশে ৩৪৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩৫১ জন। গড়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ জন মানুষের মৃত্যু-এ এক নীরব মহামারি, যা আমাদের চোখের সামনে ঘটছে,অথচ প্রতিকার যেন অধরাই থেকে যাচ্ছে। আহত হয়েছেন দুই হাজারেরও বেশি মানুষ, যাদের অনেকেই হয়তো আজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করবেন।

এই চিত্র শুধু একটি সময়ের নয়; এটি আমাদের সামগ্রিক সড়ক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার প্রতিফলন। আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেও বাংলাদেশের অবস্থান উদ্বেগজনক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ১.১৯ মিলিয়ন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়, এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতেই ঘটে মোট মৃত্যুর ৯০ শতাংশের বেশি। বাংলাদেশ এই ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর তালিকায় দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে।

বিশেষভাবে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, চলতি ঈদযাত্রায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা সবচেয়ে বেশি প্রাণ কেড়েছে। ১৪৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১১৬ জনের মৃত্যু-যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৩৯ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান আমাদের স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয় যে, মোটরসাইকেল এখন দেশের সড়ক নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

সহজলভ্যতা,দ্রুতগতি এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সবিহীন চালকদের উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।

একইসঙ্গে পথচারীদের মৃত্যুও কম উদ্বেগজনক নয়। ৪৭ জন পথচারীর প্রাণহানি প্রমাণ করে যে, আমাদের সড়ক এখনো মানুষের জন্য নিরাপদ নয়। ফুটপাত দখল,জেব্রা ক্রসিংয়ের অভাব, ট্রাফিক আইন অমান্য-সব মিলিয়ে পথচারীরা প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে পড়ছেন।

সড়কের ধরন অনুযায়ী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে আঞ্চলিক সড়কে। জাতীয় মহাসড়কেও দুর্ঘটনার সংখ্যা কম নয়। এর পেছনে রয়েছে সড়কের নকশাগত ত্রুটি, অপরিকল্পিত মোড়,পর্যাপ্ত সাইনেজের অভাব এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। উন্নত দেশগুলোতে ‘রোড সেফটি অডিট’ একটি বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া হলেও বাংলাদেশে তা এখনো সীমিত পরিসরে রয়েছে।

দুর্ঘটনার কারণ বিশ্লেষণ করলে আরও স্পষ্ট হয় সমস্যার গভীরতা। সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে-১৫২টি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মুখোমুখি সংঘর্ষ,পেছন থেকে ধাক্কা,এবং পথচারীকে চাপা দেওয়ার ঘটনা। এসবই নির্দেশ করে যে,চালকদের দক্ষতার ঘাটতি,অতিরিক্ত গতি, এবং আইন অমান্য করার প্রবণতা আমাদের সড়ককে ক্রমাগত অনিরাপদ করে তুলছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-আইনের প্রয়োগ। বাংলাদেশে সড়ক পরিবহন আইন থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। উন্নত দেশগুলোতে ট্রাফিক আইন ভাঙলে তাৎক্ষণিক জরিমানা,লাইসেন্স বাতিল বা পয়েন্ট কাটা-এসব কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রেই আইন প্রয়োগে শিথিলতা দেখা যায়, যা চালকদের মধ্যে এক ধরনের দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি করেছে।

এছাড়া যানবাহনের ফিটনেসও একটি বড় সমস্যা। রাস্তায় চলাচলকারী বহু যানবাহনই ফিটনেসহীন, ব্রেক বা লাইট সঠিকভাবে কাজ করে না, তবুও সেগুলো নির্বিঘ্নে চলাচল করছে। এই পরিস্থিতি শুধু দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায় না, বরং দুর্ঘটনার পরিণতিও আরও মারাত্মক করে তোলে।

আরেকটি বড় দিক হলো গণপরিবহনের চালকদের কর্মপরিবেশ। দীর্ঘ সময় ড্রাইভিং,পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব এবং অতিরিক্ত যাত্রী তোলার চাপ-সব মিলিয়ে তারা মানসিক ও শারীরিকভাবে ক্লান্ত অবস্থায় গাড়ি চালান। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) বারবার বলেছে,চালকদের জন্য নির্ধারিত কর্মঘণ্টা নিশ্চিত না করলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

অন্য একটি বড় কারণ হলো নীতিনির্ধারকদের অসংলগ্ন ও দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য। দুর্ঘটনার পর প্রায়ই দেখা যায়,কোনো কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি ঘটনাকে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলে দায় এড়িয়ে যান, কিংবা চালকের ওপর দোষ চাপিয়ে বিষয়টি ছোট করে দেখার চেষ্টা করেন। বাস্তবতা হলো,সড়ক দুর্ঘটনা কখনোই নিছক দুর্ঘটনা নয়-এটি একটি কাঠামোগত ব্যর্থতা। যখন রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলরা দায় স্বীকার না করে বরং দায় এড়িয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি তৈরি করেন, তখন সমস্যার সমাধান আরও দূরে সরে যায়।

এখানে একটি বড় প্রশ্ন উঠে আসে-বর্তমান সড়ক পরিবহন আইন কি যথেষ্ট কার্যকর? ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর সড়ক পরিবহন আইন প্রণয়ন করা হলেও এর বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে রয়েছে ব্যাপক প্রশ্ন। আইনে শাস্তির বিধান থাকলেও তা প্রয়োগে রয়েছে শৈথিল্য, রাজনৈতিক প্রভাব এবং নানা ধরনের আপস। ফলে আইনের ভয় অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর হয় না।

এমন বাস্তবতায় নতুন করে একটি আধুনিক, যুগোপযোগী ও কঠোর সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের দাবি জোরালো হয়ে উঠছে। এই আইনে শুধু শাস্তি বাড়ালেই হবে না, বরং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিতকরণ এবং সড়ক ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনা তদন্তে একটি স্বাধীন ও পেশাদার সংস্থা গঠন করাও জরুরি।

বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। প্রথমত, চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া আরও কঠোর ও স্বচ্ছ করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নে বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে-যেখানে পথচারী,সাইকেল আরোহী এবং গণপরিবহন ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা সমানভাবে গুরুত্ব পাবে।

তৃতীয়ত, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। সিসিটিভি ক্যামেরা,স্পিড মনিটরিং সিস্টেম,এবং ডিজিটাল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালু করলে আইন প্রয়োগ আরও কার্যকর হবে।

চতুর্থত, জনসচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। স্কুল-কলেজ পর্যায়ে সড়ক নিরাপত্তা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।
সবশেষে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক দৃঢ়তা ছাড়া এই সংকট থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়। সড়ক দুর্ঘটনা কোনো ‘দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা’ নয়; এটি একটি প্রতিরোধযোগ্য সংকট। প্রতিটি মৃত্যু একটি ব্যর্থতার প্রতীক-ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা,নীতির ব্যর্থতা এবং আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ববোধের ব্যর্থতা।

ঈদের আনন্দ যেন আর কখনো শোকের কারণ না হয়-এই প্রত্যাশা বাস্তবায়ন করতে হলে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। নইলে আগামী বছরও একই শিরোনাম,একই পরিসংখ্যান,আর একই কান্না আমাদের সামনে ফিরে আসবে।

লেখকঃ কলামিস্ট,সোস্যাল এক্টিভিস্ট,ভাইস-চেয়ারম্যান,নিরাপদ সড়ক চাই

The short URL of the present article is: https://www.nirapadnews.com/afg4
Notify of
guest
0 মন্তব্য
সবচেয়ে পুরাতন
সবচেয়ে নতুন Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Advertisements
সর্বশেষ
- Advertisements -
এ বিভাগে আরো দেখুন