শক্তিশালী ও টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করা অপরিহার্য

- Advertisements -

লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল: গণতন্ত্র এমন একটি শাসনব্যবস্থা যেখানে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা জনগণের হাতে ন্যস্ত থাকে। আব্রাহাম লিংকনের মতে গণতন্ত্র হচ্ছে ‘Democracy is the government of the people, by the people, for the people’ অর্থাৎ ‘জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য এবং জনগণের শাসন’ ব্যবস্থাকে গণতন্ত্র বলে।

গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো জনগণের অংশগ্রহণ। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকরা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে তাদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশ নেয়। নির্বাচন এই ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ তাদের পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচন করে এবং সেই প্রতিনিধিরাই সরকার গঠন করে। এর ফলে রাষ্ট্রক্ষমতা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে সীমাবদ্ধ না থেকে জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটায়।

গণতন্ত্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আইনের শাসন। এখানে সবাই আইনের চোখে সমান ধনী-গরিব, ক্ষমতাবান-সাধারণ নাগরিক, সবাই একই আইনের আওতায় পড়ে। বিচারব্যবস্থা স্বাধীন থাকে এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষা করে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, সুশাসন এসবই গণতন্ত্রের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য।

গণতন্ত্র কেবল একটি শাসনব্যবস্থা নয়-এটি একটি মূল্যবোধ, একটি চর্চা, একটি সংস্কৃতি। যেখানে জনগণের মতামত, অংশগ্রহণ এবং অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেখানেই গণতন্ত্র বিকশিত হয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, অনেক দেশে বিশেষ করে উন্নয়নশীল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রতিহিংসার রাজনীতি গণতন্ত্রের মূল চেতনাকে দুর্বল করে দেয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু মনে করা, ক্ষমতায় এসে প্রতিশোধ নেওয়ার প্রবণতা, এবং রাষ্ট্রীয় যন্ত্রকে ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থে ব্যবহার এসবই গণতন্ত্রের জন্য বড় হুমকি।

প্রতিহিংসার রাজনীতি বলতে এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে বোঝায়, যেখানে ক্ষমতার পালাবদলের সাথে সাথে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা, হয়রানি, দমন-পীড়ন বা প্রশাসনিক নিপীড়ন চালানো হয়। এটি কেবল রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে না, বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা কমিয়ে দেয়। যখন জনগণ দেখে যে আইন ও বিচারব্যবস্থা নিরপেক্ষ নয়, বরং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে, তখন গণতন্ত্রের ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে যায়।

একটি সুস্থ গণতন্ত্রে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে, মতপার্থক্য থাকবে কিন্তু তা হবে নীতির ভিত্তিতে, প্রতিহিংসার ভিত্তিতে নয়। বিরোধী দল গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা সরকারের সমালোচনা করবে, বিকল্প প্রস্তাব দেবে, এবং জনগণের কণ্ঠস্বর তুলে ধরবে। কিন্তু যদি বিরোধী দলকে দমন করা হয়, তাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করা হয়, তাহলে গণতন্ত্র একমুখী হয়ে পড়ে। এতে করে স্বৈরতন্ত্রের ঝুঁকি বাড়ে।

প্রতিহিংসার রাজনীতি সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করে। মানুষ দলীয় পরিচয়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ কমে যায়, এবং সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট হয়। একটি রাষ্ট্র তখন আর সম্মিলিতভাবে এগোতে পারে না। উন্নয়ন থমকে যায়, কারণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

Advertisements

বাংলাদেশসহ অনেক দেশে আমরা এই প্রবণতা দেখতে পাই। ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সাথে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার, বা প্রশাসনিক হয়রানির ঘটনা ঘটে। এর ফলে রাজনৈতিক সংস্কৃতি আরও কঠোর ও অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে। নতুন প্রজন্মের কাছে রাজনীতি একটি নেতিবাচক চিত্র পায়, যা ভবিষ্যতের জন্য অশনি সংকেত।

প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করতে হলে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। ক্ষমতায় থাকা দলকে বুঝতে হবে যে, রাষ্ট্র তাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। একইভাবে বিরোধী দলকেও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। তারা যেন সহিংসতা বা অরাজকতার পথে না গিয়ে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আন্দোলন চালায়।

শক্তিশালী ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন সংস্থা, গণমাধ্যম প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। যখন এসব প্রতিষ্ঠান নিরপেক্ষভাবে কাজ করবে, তখন প্রতিহিংসার রাজনীতির সুযোগ কমে আসবে।

আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হতে হবে, সে যে দলেরই হোক না কেন। যদি কেউ অপরাধ করে, তাহলে তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে, কিন্তু তা হতে হবে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আইন প্রয়োগ করলে তা ন্যায়বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। আমাদের সমাজে সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, এবং ভিন্নমতকে গ্রহণ করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষা, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তারা যদি সচেতনতা তৈরি করে, তাহলে মানুষ প্রতিহিংসার রাজনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারবে।

গণমাধ্যমের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারে এবং রাজনৈতিক অপব্যবহার তুলে ধরতে পারে। কিন্তু যদি গণমাধ্যমও দলীয় প্রভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে সত্য চাপা পড়ে যায় এবং প্রতিহিংসার রাজনীতি আরও শক্তিশালী হয়।

নাগরিক সমাজ ও সচেতন জনগণ গণতন্ত্রের মূল শক্তি। তারা যদি নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়, তাহলে রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য হবে নিজেদের আচরণ পরিবর্তন করতে। ভোটের মাধ্যমে জনগণ প্রতিহিংসার রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে।

একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক সংলাপ। বিরোধী দল ও সরকার যদি আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে চায়, তাহলে সংঘাত কমে যাবে। সংলাপের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারলে প্রতিহিংসার রাজনীতি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও আমাদের জন্য শিক্ষণীয়। যেসব দেশে গণতন্ত্র শক্তিশালী, সেখানে রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে নয়, বরং প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে। তারা ক্ষমতায় এলে প্রতিশোধ নেওয়ার পরিবর্তে নীতি বাস্তবায়নে মনোযোগ দেয়। এই মানসিকতা আমাদের দেশেও গড়ে তুলতে হবে।

Advertisements

টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু নির্বাচন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ, যেখানে সকল মতের প্রতি সম্মান থাকবে। প্রতিহিংসার রাজনীতি এই পরিবেশকে ধ্বংস করে দেয়। তাই এটি পরিহার করা অপরিহার্য।

অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং গণতন্ত্র একে অপরের পরিপূরক। যদি রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকে, তাহলে বিনিয়োগ কমে যায়, কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হয়, এবং দারিদ্র্য বাড়ে। তাই অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্যও প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি।

যুবসমাজকে ইতিবাচক রাজনীতিতে যুক্ত করতে হবে। তারা যদি দেখে রাজনীতি মানেই সংঘাত ও প্রতিহিংসা, তাহলে তারা দূরে সরে যাবে। কিন্তু যদি তারা দেখে রাজনীতি মানুষের কল্যাণের জন্য, তাহলে তারা আগ্রহী হবে এবং একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠবে।

প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করা শুধু একটি নৈতিক দায় নয়, এটি একটি বাস্তব প্রয়োজন। শক্তিশালী ও টেকসই গণতন্ত্র গড়ে তুলতে হলে আমাদের সবাইকে রাজনৈতিক নেতা, কর্মী, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষ একসাথে কাজ করতে হবে। সহনশীলতা, ন্যায়বিচার এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারলেই আমরা একটি উন্নত, স্থিতিশীল এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন করতে পারব।

গণতন্ত্র টিকে থাকে মানুষের আস্থার উপর। সেই আস্থা ধরে রাখতে হলে প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে ন্যায়নিষ্ঠ, দায়িত্বশীল, আদর্শিক ও মানবিক রাজনীতির চর্চা করতে হবে। মানুষের মানবিক মর্যাদা, সাম্য ও সুশাসন নিশ্চিত করতে পারস্পরিক সৌহার্দপূর্ণ এবং ইতিবাচক রাজনীতি প্রয়োজন। ফলে শক্তিশালী ও টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করা অপরিহার্য।

লেখক পরিচিত:
লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল
(শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক)
যুগ্মমহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) কেন্দ্রীয় কমিটি
৭০ কাকরাইল, ঢাকা।

The short URL of the present article is: https://www.nirapadnews.com/4knx
Notify of
guest
0 মন্তব্য
সবচেয়ে পুরাতন
সবচেয়ে নতুন Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Advertisements
সর্বশেষ
- Advertisements -
এ বিভাগে আরো দেখুন