চিকিৎসকেরা একটি কথা বারবার বলে থাকেন, যা আমরা কমবেশি সবাই শুনেছি–অকারণে মুড়ি- মুড়কির মতো পেইনকিলার বা ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া কিংবা এর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া একেবারেই উচিত নয়। চিকিৎসকদের এই সতর্কবার্তার পেছনের আসল কারণগুলো কী, তা আমাদের সবারই জেনে রাখা দরকার।
মানুষের শরীর এবং মস্তিষ্ক এমন এক অদ্ভুত উপায়ে তৈরি যে, কোনো একটি নির্দিষ্ট পদার্থের দ্বারা যদি ক্রমাগত একে আঘাত করা হয়, তবে শরীর একসময় তা সহ্য করতে শিখে যায়। পেইনকিলারের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটাই ঘটে। আমরা যদি নিয়মিত বা অহেতুক পেইনকিলার খেতে থাকি, তবে আমাদের শরীরের ব্যথাবোধের পথগুলো বা নিউরাল পাথওয়েগুলো (Neural Pathways) সেই ওষুধের সঙ্গে মানিয়ে নেয়। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘রিসেপ্টর মডিফিকেশন’ বলা হয়।
এর ফলে যে ব্যথা আগে একটি বা দুটি পেইনকিলারে কমে যেত, ক্রমাগত খাওয়ার কারণে একসময় দেখা যায় সেই একই ব্যথায় চার-পাঁচটি ওষুধেও আর কোনো কাজ হচ্ছে না। ডাক্তারি পরিভাষায় একে বলে ‘রেজিস্ট্যান্স টু দি অ্যানালজেসিক এফেক্ট অব পেইনকিলারস’ (Resistance to the analgesic effect of painkillers)। এর সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো, ভবিষ্যতে যখন কোনো বড়
দুর্ঘটনা বা অস্ত্রোপচারের পর সত্যি সত্যি পেইনকিলার খাওয়ার তীব্র প্রয়োজন হবে, তখন নির্দিষ্ট ডোজে সেই ওষুধ আর শরীরে কোনো কাজ করতে পারে না।
যারা দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ইচ্ছামতো পেইনকিলার খান, তাদের কিডনির ওপর অত্যন্ত ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। অতিরিক্ত পেইনকিলার খাওয়ার ফলে অনেক সময় তা শরীর থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে বের হতে পারে না এবং কিডনিতে জমতে শুরু করে। এর ফলে কিডনিতে ‘অ্যাকিউট টিউবুলার নেক্রোসিস’ বা ‘অ্যাকিউট ইন্টারস্টিশিয়াল নেফ্রাইটিস’-এর মতো জটিল রোগ দেখা দিতে পারে। কিডনির এই সাময়িক ক্ষতি পরবর্তী সময়ে স্থায়ী রূপ নিতে পারে, যার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে রোগীকে বাঁচিয়ে রাখতে ডায়ালাইসিস পর্যন্ত দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
বেশি পেইনকিলার খেলে শুধু কিডনিই নয়, শরীরের অন্যতম প্রধান অঙ্গ লিভারও গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে ক্রনিক লিভার ডিজিজ বা ‘অ্যাকিউট হেপাটিক ইনজুরি’ হওয়ার প্রবণতা অনেক বেড়ে যায়। চিকিৎসাক্ষেত্রে এমন অনেক রোগী দেখা যায়, যাদের অতিরিক্ত পেইনকিলার খাওয়ার কারণে ‘অ্যাকিউট হেপাটিক ফেলিওর’ বা লিভার পুরোপুরি বিকল হয়ে গেছে। পেইনকিলার লিভারের ওপর এতটাই চাপ সৃষ্টি করে যে লিভার তার স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
লিভার এবং কিডনির ওপর পেইনকিলারের এই অদ্ভুত ও গুরুতর ক্ষতিকর প্রভাবের কারণেই বিনা প্রেসক্রিপশনে নিজের ইচ্ছামতো ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া একদমই উচিত নয়। এটি সত্য যে, তীব্র ব্যথায় ভুগতে থাকা কিছু রোগীকে পেইনকিলার না দিয়ে চিকিৎসকদের কোনো উপায়ও থাকে না।
কিন্তু কোন রোগীকে, কোন ধরনের ব্যহার জন্য, কোন পেইনকিলারটি কতটা ডোজে এবং কতদিন দিতে হবে, তা একমাত্র একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকই ভালো বোঝেন।
তাই সুস্থ থাকতে শরীর ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোকে সুরক্ষিত রাখুন; সামান্য ব্যথায় পেইনকিলার না খেয়ে সবসময় চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
