তকীউদ্দিন মুহাম্মদ আকরাম উল্লাহ: দেশের উত্তরাঞ্চলের অবহেলিত জনপদ কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার জামতলা গ্রামে শুরু হয়েছে নতুন সম্ভাবনার গল্প। সুবিধাবঞ্চিত নারীদের আত্মনির্ভরশীল করে তুলতে এখানে যাত্রা শুরু করেছে ‘আবুল হোসেন কোরেশী প্রকল্প-২’। প্রাথমিকভাবে ৯০ জন নারীকে নিয়ে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ এখন স্বপ্ন দেখাচ্ছে বদলে যাওয়ার।
সিলেটি কন্যা নাদিরা আবুল কোরেশী। শৈশব থেকেই আঁকাআঁকি ও নকশা করার শখ তার। সেই শখের হাত ধরেই কৈশোরে তিনবার জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেন তিনি। কলেজের গণ্ডি শেষে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান নাদিরা। পড়াশোনা শেষে সেখানেই কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন কানাডা প্রবাসী সিলেটি সন্তান রাশেদ ওয়াহিদের সঙ্গে। বর্তমানে তারা দু’জনেই যুক্তরাষ্ট্রে ভিন্ন দুটি আইটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। এক পুত্র সন্তান নিয়ে সুখের সংসার তাদের। প্রবাসে থাকলেও নাদিরার হৃদয়জুড়ে রয়েছে মাতৃভূমি বাংলাদেশ এবং দেশের মানুষের প্রতি গভীর টান।
বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরা এবং পিছিয়ে থাকা মানুষদের কর্মদক্ষ করে গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা থেকেই নিজের শৈশবের শখ—আঁকাআঁকি ও নকশাকে ঘিরে পরিকল্পনা শুরু করেন নাদিরা।
কুড়িগ্রামের এই নতুন প্রকল্পে নারীদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১৮ থেকে ২১ এপ্রিল চারদিনব্যাপী বুটিক বিষয়ক বিশেষ প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। এতে অংশগ্রহণকারীদের হাতের কাজ, হাতে সেলাই ও দর্জি কাজসহ ব্লকের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। এর মাধ্যমে তাদের আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠার পথ তৈরি করা হচ্ছে।
নাদিরা কোরেশী জানান, তার লক্ষ্য উত্তরবঙ্গের নারীদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলা। তার বিশ্বাস, নারীরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হলে পুরো অঞ্চলই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাবে।
এর আগে সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার কানিশাইল গ্রামে সুবিধাবঞ্চিত নারী ও কন্যাদের নিয়ে একই উদ্যোগ শুরু করেন নাদিরা। সেখানে ‘আবুল হোসেন কোরেশী প্রকল্প’-এর মাধ্যমে কাপড় বোনা, নকশা, বুটিক ও পোশাক তৈরির প্রশিক্ষণ দিয়ে একটি উৎপাদনকেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতাকেই কাজে লাগিয়ে এবার উত্তরবঙ্গে শুরু হলো দ্বিতীয় ধাপের কার্যক্রম।
নাদিরার স্বপ্ন, এসব নারীদের নিয়ে একটি বৃহৎ উদ্যোক্তা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা। তাদের তৈরি পণ্য বাজারজাত করতে তিনি ‘শাটী’ নামে একটি ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা করেছেন, যার পণ্য ইতোমধ্যে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের প্রায় ২৫টি দেশে পৌঁছেছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—এই আয় সরাসরি সংশ্লিষ্ট নারী ও কন্যাদের কাছেই ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক উন্নয়নেও গুরুত্ব দিচ্ছেন নাদিরা। প্রকল্পের আওতাভুক্ত পরিবারের মেয়েদের শিক্ষাবৃত্তি প্রদান, কম্পিউটার ও আইটি প্রশিক্ষণ এবং সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
