ডা. খাজা নাজিমউদ্দীন: ঈদুল আজহা মানেই উৎসবের আমেজ এবং প্রিয়জনদের সঙ্গে রসনা তৃপ্তির আয়োজন। কোরবানির ঈদের মূল আকর্ষণ হলো লাল মাংস বা বিফ। তবে এই উৎসবের আনন্দ অনেক সময় ম্লান হয়ে যায় অতিরিক্ত মাংস গ্রহণের ফলে সৃষ্ট হজমজনিত সমস্যায়। বুকজ্বালা, গ্যাস, পেট ফাঁপা বা বদহজমের মতো সমস্যাগুলো কোরবানি-পরবর্তী সময়ে খুবই সাধারণ বিষয়। কিন্তু এই সমস্যাগুলো কখন সাধারণ আর কখন বিপদের সংকেত, তা জানা থাকা জরুরি।
কেন হয় এই সমস্যা?
কোরবানির ঈদে আমরা সাধারণত যে ধরনের ভুলগুলো করি, তার ফলে হজমতন্ত্রের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ে।
অতিরিক্ত প্রোটিন ও ফ্যাট: মাংসের চর্বি হজম হতে দীর্ঘ সময় নেয়। অধিক পরিমাণে মাংস খেলে পাকস্থলীর এসিড নিঃসরণ বেড়ে যায়, যা বুকজ্বালা বা হার্টবার্নের সৃষ্টি করে।
অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস: ঈদের দিন ঘন ঘন মাংস খাওয়ার ফলে পাকস্থলীতে অতিরিক্ত গ্যাসের সৃষ্টি হয়, যা পেটব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
পরিশোধিত শর্করা ও পানীয়: মাংসের সঙ্গে কোমল পানীয় বা অতিরিক্ত মিষ্টিজাতীয় খাবার খাওয়ার প্রবণতা হজম প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়।
ফাইবার ও শাকসবজির অভাব: মাংসের তুলনায় সবজি কম খাওয়ার ফলে হজম প্রক্রিয়ায় স্থবিরতা আসে, যা কোষ্ঠকাঠিন্যের ঝুঁকি বাড়ায়। এছাড়া অনেকেই মনে করেন কোরবানির তাজা মাংস সঙ্গে সঙ্গে রান্না করে খেলে স্বাদ বেশি হয়। সদ্য কাটা মাংস সাধারণত শক্ত থাকে এবং তা হজম করতেও তুলনামূলক বেশি সময় লাগে। মাংস কিছু সময় সংরক্ষণ করে রান্না করলে এর গঠন কিছুটা নরম হয়, যা হজমে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত তেল-মসলা ব্যবহার করে রান্না করা খাবার পাকস্থলীর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। তাই রান্নায় স্বাস্থ্যকর পদ্ধতি অনুসরণ করা জরুরি। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি, ডায়াবেটিক রোগী, উচ্চ রক্তচাপের রোগী এবং যাদের আগে থেকেই গ্যাস্ট্রিক বা হজমের সমস্যা আছে, তাদের খাদ্য গ্রহণে আরও বেশি সচেতন হওয়া প্রয়োজন। সামান্য অসাবধানতাও উৎসবের আনন্দকে শারীরিক ভোগান্তিতে পরিণত করতে পারে।
লক্ষণ
বদহজমে সাধারণত পেট ভারী লাগা, অল্প বুকজ্বালা বা ঢেকুর ওঠা দেখা যায়। তবে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে অবশ্যই সতর্ক হতে হবে:
তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা: যদি পেটের ওপরের দিকে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভূত হয়; যা কিছুতেই কমছে না, তবে তা গ্যাস্ট্রিক আলসার বা প্যানক্রিয়াটাইটিসের লক্ষণ হতে পারে।
বমি বা বমি ভাব: বারবার বমি হওয়া বা বমির সঙ্গে রক্ত আসা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
মলদ্বারে রক্তপাত বা কালো পায়খানা: এটি পরিপাকতন্ত্রে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের নির্দেশক হতে পারে।
শ্বাসকষ্ট বা বুকে প্রচণ্ড চাপ: অনেক সময় হার্ট অ্যাটাকের ব্যথাকে মানুষ গ্যাসের ব্যথা বলে ভুল করে। যদি বুকের ব্যথা চোয়ালে বা বাম হাতে ছড়িয়ে পড়ে এবং শ্বাসকষ্ট হয়, তবে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
জ্বর ও কাঁপুনি: বদহজমের সঙ্গে যদি উচ্চমাত্রার জ্বর থাকে, তবে তা পিত্তথলিতে ইনফেকশন বা অন্য কোনো জটিল সংক্রমণের ইঙ্গিত দিতে পারে।
যেভাবে সতর্ক থাকবেন
কোরবানি-পরবর্তী সময় সুস্থ থাকতে কিছু সাধারণ নিয়ম মেনে চলা আবশ্যক।
সংযম পালন: একবারে অনেক মাংস না খেয়ে অল্প অল্প করে বারবার খান। মাংস রান্নার সময় চর্বি ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করুন।
শাকসবজি ও ফাইবার: মাংসের সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে সালাদ, শসা, লেবু ও ফাইবারযুক্ত সবজি রাখুন। ফাইবার হজম প্রক্রিয়াকে সচল রাখে।
প্রচুর পানি পান: সারাদিনে অন্তত ২-৩ লিটার পানি পান করুন। এটি শরীর থেকে টক্সিন বের করতে সাহায্য করবে।
হাঁটাচলা: ভারী খাবার খাওয়ার পরপরই শুয়ে পড়বেন না। অন্তত ৩০ মিনিট হালকা হাঁটাহাঁটি করুন। এটি বিপাক বা মেটাবলিজম বাড়াতে সহায়তা করে।
ওষুধের ব্যবহার: যেকোনো ওষুধের ওপর অতি-নির্ভরশীল না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সাধারণ গ্যাসের সমস্যার জন্য চিকিৎসকের দেওয়া অ্যান্টাসিড বা প্রো-কাইনেটিক ওষুধ সেবন করতে পারেন।
কোরবানির আনন্দ যাতে অসুস্থতায় রূপ না নেয়, তার জন্য সচেতনতাই শ্রেষ্ঠ উপায়। আপনার শরীর আপনারই আয়না; সুতরাং অতিরিক্ত মাংস খাওয়ার পর শরীর কোনো অস্বাভাবিক সংকেত দিচ্ছে কিনা, সেদিকে খেয়াল রাখুন। ওপরে উল্লিখিত জটিল লক্ষণগুলোর কোনোটি দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সুস্থ থাকলে তবেই পরবর্তী ঈদগুলোতেও আনন্দ ভাগ করে নেওয়া সম্ভব হবে।
[বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক]
