নিউমোনিয়ার ঝুঁকি প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও জনসচেতনতা

- Advertisements -
ডা. মো. তালহা চৌধুরী: বর্তমান সময়ে আমাদের দেশে ঋতু পরিবর্তনের ধরন অনেকটাই অনিয়মিত- একদিন প্রচণ্ড গরম, পরদিন বৃষ্টি, আবার কখনও ঠাণ্ডা বাতাস। আবহাওয়ার এই হঠাৎ পরিবর্তনে শরীরের স্বাভাবিক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ বৃদ্ধি পায়। এর মধ্যে নিউমোনিয়া একটি গুরুতর এবং কখনও প্রাণঘাতী রোগ হিসেবে দেখা দেয়, বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে। এটি মূলত ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস অথবা কখনও ছত্রাকের সংক্রমণের কারণে হয়ে থাকে। যেমন- স্ট্রেপটোকক্কাস নিউমোনিয়ে নামে ব্যাকটেরিয়া ও ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লু ভাইরাস এ রোগের সাধারণ কারণ। সংক্রমণের ফলে ফুসফুসের বায়ুথলিতে প্রদাহ সৃষ্টি হয়। সেখানে তরল বা পুঁজ জমে। ফলে অক্সিজেন গ্রহণ ব্যাহত হয়।

ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তির মধ্যে রয়েছে- ৫ বছরের কম বয়সী শিশু, ৬৫ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তি, ডায়াবেটিস, কিডনি বা হৃদরোগে আক্রান্ত রোগী, দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসনালির বাধাজনিত রোগ, হাঁপানি বা অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, ধূমপায়ী এবং যাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল।

নিউমোনিয়ার সাধারণ লক্ষণের মধ্যে রয়েছে খুব বেশি জ্বর, ঠাণ্ডা লাগা, কাশি (শুকনো বা কফসহ), শ্বাসকষ্ট, বুকব্যথা। গুরুতর লক্ষণের মধ্যে দেখা যায় দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস, ঠোঁট ও নখ নীলচে হয়ে যাওয়া, বিভ্রান্তি (বিশেষ করে বয়স্কদের ক্ষেত্রে) এবং শিশুর ক্ষেত্রে শ্বাস নেওয়ার সময় বুক ভেতরে ঢুকে যাওয়া। বর্তমান আবহাওয়ায় নিউমোনিয়ার ঝুঁকি বাড়ার কারণ হলো- হঠাৎ তাপমাত্রা ওঠানামা, বৃষ্টির কারণে আর্দ্রতা বৃদ্ধি, ভাইরাল ফ্লু সংক্রমণ বৃদ্ধি, বায়ুদূষণ ও ধুলাবালি এবং ভেজা পরিবেশে দীর্ঘসময় অবস্থান।

Advertisements

প্রতিরোধের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়া এবং হাঁচি-কাশির সময় মুখ ঢেকে রাখা প্রয়োজন। পরিবেশগতভাবে ঘরের পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা এবং ধুলাবালি কমানো উচিত। পুষ্টিকর খাদ্য, যেমন- ভিটামিন সি, এ এবং প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ, পর্যাপ্ত পানি পান, পর্যাপ্ত ঘুম এবং ধূমপান পরিহার করাও জরুরি। টিকাদান নিউমোনিয়া প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর।

নিউমোকক্কাল টিকা ও ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকা বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক এবং ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রোগ নির্ণয়ে রোগের লক্ষণ মূল্যায়ন, বুকের এক্স-রে, সম্পূর্ণ রক্ত পরীক্ষা, প্রদাহ নির্ণয়ের রক্ত পরীক্ষা এবং রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা পরিমাপ করা হয়ে থাকে। চিকিৎসার ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণে জীবাণুনাশক ওষুধ ব্যবহার করা হয়, ভাইরাসজনিত সংক্রমণে উপসর্গভিত্তিক সহায়ক চিকিৎসা দেওয়া হয়, প্রয়োজনে অক্সিজেন দিয়ে চিকিৎসা করা হয় এবং গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি প্রয়োজন হতে পারে। নিজে নিজে জীবাণুনাশক ওষুধ সেবন করা বিপজ্জনক এবং ওষুধের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। বাড়িতে যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত বিশ্রাম, গরম তরল পানীয় (যেমন স্যুপ, লেবু পানি), ভাপ নেওয়া এবং জ্বর থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জ্বর ও ব্যথা কমানোর ওষুধ সেবন করা যেতে পারে। জনসচেতনতার জন্য বার্তা হলো- কাশি ও জ্বরকে অবহেলা নয়। তিন দিনের বেশি স্থায়ী হলে পরীক্ষা করুন। শ্বাসকষ্ট মানেই সতর্ক সংকেত হলো, দেরি না করে চিকিৎসা নিন। এটি একটি প্রতিরোধ ও চিকিৎসাযোগ্য রোগ।

লেখক : পরামর্শক, পরিবারভিত্তিক চিকিৎসা

Advertisements

চেম্বার : আলোক হেলথকেয়ার, মিরপুর-১০, ঢাকা

The short URL of the present article is: https://www.nirapadnews.com/ca04
Notify of
guest
0 মন্তব্য
সবচেয়ে পুরাতন
সবচেয়ে নতুন Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Advertisements
সর্বশেষ
- Advertisements -
এ বিভাগে আরো দেখুন