গাজা নিয়ে ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কী, দখল নাকি জনশূন্য ভূখণ্ড?

- Advertisements -

দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধ, ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক চাপের পরও গাজায় ইসরায়েলের সামরিক উপস্থিতি কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং যুদ্ধবিরতির পরও নতুন নতুন এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়া, সামরিক ঘাঁটি স্থাপন এবং গাজার আরও বড় অংশ দখলের ইঙ্গিত বিশ্লেষকদের মধ্যে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে- গাজা নিয়ে ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা আসলে কী?

সম্প্রতি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এক অনুষ্ঠানে বলেন, ইসরায়েল বর্তমানে গাজার ৬০ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। তিনি এ নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়িয়ে ৭০ শতাংশে নেওয়ার পরিকল্পনার কথাও ইঙ্গিত দেন। তার এই বক্তব্যের পর নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে, যুদ্ধের ঘোষিত লক্ষ্য হামাসকে দুর্বল করা হলেও বাস্তবে গাজায় স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে কি না।

যুদ্ধবিরতির পরও সম্প্রসারণ
২০২৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি ও শান্তি পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছিল। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময় পর ইসরায়েলি বাহিনীর ধাপে ধাপে পিছু হটার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে উল্টো চিত্র দেখা গেছে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ও স্যাটেলাইট তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পরও ইসরায়েল গাজার আরও কিছু এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। একই সঙ্গে স্থাপন করেছে নতুন সামরিক অবকাঠামো ও ঘাঁটি। ফলে অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, সাময়িক নিরাপত্তা বলয়ের পরিবর্তে স্থায়ী উপস্থিতির ভিত্তি তৈরি করা হচ্ছে।

‘নিরাপত্তা’ নাকি ‘দখল’?
ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, হামাসের হামলা ঠেকাতে গাজায় নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। তবে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, যদি কোনো রাষ্ট্র সামরিক শক্তি ব্যবহার করে অন্য ভূখণ্ডের ওপর স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, তাহলে তা কার্যত দখল বা সংযুক্তিকরণের পর্যায়ে পড়ে।

Advertisements

আন্তর্জাতিক বিচার আদালত ও জাতিসংঘের বিভিন্ন অবস্থান অনুযায়ী, বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ভূখণ্ড দখল আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফলে গাজায় ইসরায়েলের বর্তমান কর্মকাণ্ড নিয়ে আইনি বিতর্ক আরও জোরালো হচ্ছে।

সংকুচিত হচ্ছে গাজার বাসযোগ্য এলাকা
যুদ্ধের ফলে গাজার অবকাঠামোর বড় অংশ ধ্বংস হয়েছে। হাসপাতাল, স্কুল, আবাসিক এলাকা এবং পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে বহু এলাকায় সাধারণ মানুষের প্রবেশ সীমিত হয়ে পড়েছে।

মানবিক সংস্থাগুলোর আশঙ্কা, যদি গাজার নিয়ন্ত্রিত এলাকা আরও কমে আসে, তাহলে সেখানে বসবাসকারী লাখো মানুষের জন্য জীবনযাপন আরও কঠিন হয়ে উঠবে। খাদ্য, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের সংকট আরও তীব্র হতে পারে।

‘স্বেচ্ছায় অভিবাসন’ বিতর্ক
গাজা নিয়ে ইসরায়েলের কিছু মন্ত্রীর বক্তব্য নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। তারা গাজার বাসিন্দাদের ‘স্বেচ্ছায় অভিবাসনের’ কথা বলেছেন। সমালোচকদের মতে, যুদ্ধ, অবরোধ ও জীবনযাত্রার চরম সংকটের মধ্যে মানুষকে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা হলে সেটিকে স্বেচ্ছায় অভিবাসন বলা কঠিন।

ফিলিস্তিনপন্থী মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ ধরনের বক্তব্যকে জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছে। তাদের আশঙ্কা, দীর্ঘমেয়াদে গাজার জনসংখ্যা কমিয়ে অঞ্চলটির রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে দেওয়ার চেষ্টা হতে পারে।

Advertisements

আন্তর্জাতিক চাপ কোথায়?
যুদ্ধের শুরুতে গাজা ইস্যু আন্তর্জাতিক কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের মনোযোগ অন্য সংঘাত ও সংকটের দিকে সরে গেছে। ফলে গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কার্যকর আন্তর্জাতিক চাপ তুলনামূলক কমে এসেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

যুক্তরাষ্ট্রও যুদ্ধবিরতির পৃষ্ঠপোষক হলেও গাজায় ইসরায়েলের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ নিয়ে কঠোর অবস্থান নেয়নি। এতে নেতানিয়াহু সরকারের জন্য কৌশলগত পরিসর আরও বেড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গাজার ভবিষ্যৎ কী?
গাজার ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। হামাসকে দুর্বল করার সামরিক লক্ষ্য ছাড়িয়ে ইসরায়েল কি স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথে এগোচ্ছে, নাকি এটি কেবল নিরাপত্তা কৌশলের অংশ- সে প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো নেই।

তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে, যুদ্ধ শেষ হলেও গাজাকে ঘিরে রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক সংকটের সমাপ্তি শিগগিরই হচ্ছে না। বরং ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ, জনসংখ্যার ভবিষ্যৎ এবং ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের সম্ভাবনা- এই তিন প্রশ্নই আগামী দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে।

The short URL of the present article is: https://www.nirapadnews.com/iarv
Notify of
guest
0 মন্তব্য
সবচেয়ে পুরাতন
সবচেয়ে নতুন Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Advertisements
সর্বশেষ
- Advertisements -
এ বিভাগে আরো দেখুন