যুক্তরাজ্যের স্থানীয় নির্বাচনে ব্যাপক ভরাডুবি হয়েছে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির। এই পরাজয়ের পর এখন রাজনীতিতে টিকে থাকাই দায় হয়ে পড়েছে দেশটির প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের। কেননা, নিজ দলের ভেতর থেকেই তার পদত্যাগের দাবি উঠতে শুরু করেছে।
সোমবার এক গুরুত্বপূর্ণ ভাষণে নির্বাচনের ফলাফলের দায় নিজের কাঁধে নেন স্টারমার। তিনি বলেন, সরকার বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি হবে এবং ‘আরও শক্তিশালী ও ন্যায়ভিত্তিক ব্রিটেন’ গঠনে লেবার পার্টির অবস্থান জনগণের সামনে তুলে ধরবে।
স্টারমার স্বীকার করেন, লেবার পার্টি কিছু ভুল করেছে। তবে তিনি দাবি করেন, সরকারের বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো সঠিক ছিল। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়ার সিদ্ধান্তকে তিনি সঠিক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় অপেক্ষমাণ রোগীর সংখ্যা কমেছে, শিশু দারিদ্র্য মোকাবিলায় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি এসেছে। তার ভাষায়, “মৌলিক ভিত্তিগুলো এখনও শক্ত রয়েছে।”
স্টারমার আরও বলেন, “আমরা শুধু কঠিন সময়ের মুখোমুখি নই, বরং বিপজ্জনক প্রতিপক্ষেরও মুখোমুখি। আমরা শুধু রিফর্ম ইউকে ও গ্রিন পার্টির বিরুদ্ধে লড়ছি না, আমরা সেই হতাশার বিরুদ্ধে লড়ছি, যেটিকে তারা ব্যবহার ও উসকে দিচ্ছে।”
তিনি রিফর্ম ইউকের নেতা নাইজেল ফারাজ এবং গ্রিন পার্টির নেতা জ্যাক পোলানস্কির সমালোচনা করে বলেন, তারা বর্তমান সময়ের জন্য প্রয়োজনীয় ‘গুরুত্বপূর্ণ ও প্রগতিশীল নেতৃত্ব’ দিতে পারবেন না।
পদত্যাগের চাপ বাড়ছে
গত সপ্তাহের স্থানীয় নির্বাচনে ইংল্যান্ডে প্রায় এক হাজার ৫০০ কাউন্সিলর হারিয়েছে লেবার পার্টি। এর বড় অংশ চলে গেছে রিফর্ম ইউকে ও গ্রিন পার্টির দখলে। এর পর থেকেই স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
লেবার দলের এমপি ক্যাথরিন ওয়েস্ট মন্ত্রিসভার সদস্যদের দ্রুত নতুন নেতৃত্ব আনার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, অন্য কেউ উদ্যোগ না নিলে তিনি নিজেই দলের এমপিদের সমর্থন জোগাড় করতে ই-মেইল পাঠাবেন।
এদিকে ৩০ জনের বেশি লেবার এমপি স্টারমারের পদত্যাগ অথবা তার সরে দাঁড়ানোর সময়সূচি ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন স্টারমারের সাবেক ঘনিষ্ঠ মিত্র জশ সিমন্স। তিনি টাইমস পত্রিকায় লিখেছেন, স্টারমার ‘দেশের আস্থা হারিয়েছেন’।
ওয়েলসে লেবার পার্টির দীর্ঘ ২৭ বছরের শাসনের অবসান হয়েছে। দেশটির ফার্স্ট মিনিস্টার এলুনেড মরগান নির্বাচনে নিজের আসন হারিয়েছেন। অন্যদিকে স্কটল্যান্ডে স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি তাদের অবস্থান ধরে রেখেছে এবং সেখানে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে লেবার পার্টি।
এখনও যাদের সমর্থন পাচ্ছেন স্টারমার
তবে দলের সবাই স্টারমারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেননি। শিক্ষা সচিব ব্রিজেট ফিলিপসন বলেছেন, নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রতিযোগিতা শুরু হলে তা আরও বড় সংকট তৈরি করতে পারে।
গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে স্টারমার নিজেই স্বীকার করেছেন যে, জনগণের কাছে পরিবর্তন আনার ব্যাপারে লেবার পার্টি পর্যাপ্ত আস্থা ধরে রাখতে পারেনি। তবে তিনি বলেন, এর মানে এই নয় যে, দলকে অতিরিক্ত ডান বা বামপন্থার দিকে ঝুঁকতে হবে।
সমর্থন ধরে রাখতে নতুন উদ্যোগ
দলের ভেতরের চাপ মোকাবিলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন এবং সাবেক উপদলীয় নেতা ব্যারোনেস হারম্যানকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োগ দিয়েছেন স্টারমার।
দলীয় নেতৃত্ব নির্বাচনের জন্য অন্তত ৮১ জন লেবার এমপির সমর্থন প্রয়োজন। সম্ভাব্য নেতৃত্বপ্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন স্বাস্থ্য সচিব ওয়েস স্ট্রিটিং, সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেইনার এবং গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহাম।
২০২৪ সালের নির্বাচনে কনজারভেটিভ পার্টির ১৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসে লেবার পার্টি। তবে এরপর থেকেই স্টারমারের জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করে। জীবনযাত্রার ব্যয় সংকটের মধ্যে শীতকালীন জ্বালানি ভাতা কমানো এবং যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত পিটার মেন্ডেলসনের সঙ্গে যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইনের সম্পর্ক নিয়ে বিতর্কও সরকারকে চাপে ফেলেছে।
এদিকে, ডানপন্থী রিফর্ম ইউকের জনপ্রিয়তা যেমন বাড়ছে, তেমনি গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের কড়া সমালোচনার কারণে গ্রিন পার্টিও তরুণ ও প্রগতিশীল ভোটারদের সমর্থন পাচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
