বিশ্ব নিরাপদ খাদ্য দিবস: নিরাপদ খাবার শুধু অধিকার নয়,বেঁচে থাকার শর্ত

- Advertisements -

এস এম আজাদ হোসেন: মানুষ বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য গ্রহণ করে। কিন্তু সেই খাদ্য যদি জীবন রক্ষার পরিবর্তে অসুস্থতা, দুর্ভোগ কিংবা মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে উন্নয়ন, অর্থনীতি কিংবা আধুনিকতার সব অর্জনই প্রশ্নের মুখে পড়ে। তাই নিরাপদ খাদ্য এখন কেবল ভোক্তার চাহিদা নয়, এটি একটি মৌলিক অধিকার এবং জনস্বাস্থ্যের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ।

প্রতি বছর ৭ জুন বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘বিশ্ব নিরাপদ খাদ্য দিবস’। দিবসটির মূল লক্ষ্য হলো খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং খাদ্য উৎপাদন থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তার গুরুত্ব তুলে ধরা। খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে যত আলোচনা হচ্ছে, বাস্তবতা হলো এখনও কোটি কোটি মানুষ ভেজাল, দূষিত ও অনিরাপদ খাদ্যের ঝুঁকিতে বসবাস করছে।
বাংলাদেশও এই চ্যালেঞ্জের বাইরে নয়। আমাদের দেশে খাদ্যে ভেজাল, রাসায়নিকের অপব্যবহার, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য প্রস্তুত ও সংরক্ষণের মতো সমস্যাগুলো দীর্ঘদিনের। মৌসুমি ফল পাকাতে ক্ষতিকর রাসায়নিক, মাছ ও মাংস সংরক্ষণে অনিয়ম, দুধ ও মসলায় ভেজাল কিংবা রাস্তার খাবারে স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রায়ই সামনে আসে। এসব ঘটনা শুধু ভোক্তার অর্থনৈতিক ক্ষতিই করে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসার, কিডনি রোগ, লিভারের জটিলতা এবং নানা ধরনের অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

একটি বিষয় আমাদের বুঝতে হবে-নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়। এটি একটি সম্মিলিত দায়িত্ব। কৃষক থেকে শুরু করে উৎপাদক, পরিবহনকারী, বাজারজাতকারী, বিক্রেতা এবং ভোক্তা-সবাই এই শৃঙ্খলের অংশ। কোথাও একটি দুর্বলতা পুরো ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিতে পারে।

Advertisements

বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে আইন রয়েছে, প্রতিষ্ঠান রয়েছে, অভিযানও পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন সংস্থা নিয়মিত তদারকি করছে। কিন্তু শুধুমাত্র অভিযান দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন নৈতিকতা, জবাবদিহি এবং সামাজিক সচেতনতার বিকাশ।

আজ আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন খাদ্যের গুণগত মান নিয়ে মানুষের উদ্বেগ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে কোনো অনিয়ম দ্রুত প্রকাশ পেলেও প্রতিরোধমূলক সংস্কৃতি এখনও শক্তিশালী হয়নি। অনেক ব্যবসায়ী অল্প লাভের জন্য মানুষের স্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছেন। এটি শুধু আইন ভঙ্গ নয়, মানবতার বিরুদ্ধেও অপরাধ।
নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। খাদ্যের উৎস শনাক্তকরণ, মান নিয়ন্ত্রণ, পরীক্ষাগার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থার উন্নয়ন সময়ের দাবি। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তোলাও জরুরি। কারণ সচেতন নাগরিকই পারে ভেজাল ও অনিরাপদ খাদ্যের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে।

একজন সামাজিক কর্মী হিসেবে আমি মনে করি, নিরাপদ খাদ্য আন্দোলনকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে। যেমন সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতা তৈরি হয়েছে, তেমনি খাদ্য নিরাপত্তা নিয়েও জনগণকে সোচ্চার হতে হবে। আমরা যদি খাদ্য কিনতে গিয়ে মান যাচাই করি, অনিয়ম দেখলে প্রতিবাদ করি এবং দায়িত্বশীল ভোক্তার ভূমিকা পালন করি, তাহলে পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব।
বিশ্ব নিরাপদ খাদ্য দিবস আমাদের শুধু একটি বার্তা দেয়-খাদ্য যেন রোগের কারণ না হয়ে সুস্থ জীবনের ভিত্তি হয়। একটি সুস্থ জাতি গঠনের জন্য নিরাপদ খাদ্যের বিকল্প নেই। উন্নত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন তখনই বাস্তব হবে, যখন দেশের প্রতিটি মানুষ নিশ্চিতভাবে বলতে পারবে-তার প্লেটে থাকা খাবার নিরাপদ।

Advertisements

আসুন, এই দিবসে আমরা প্রতিজ্ঞা করি-নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা হবে রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তির যৌথ অঙ্গীকার। কারণ নিরাপদ খাদ্য মানেই নিরাপদ জীবন, সুস্থ পরিবার এবং শক্তিশালী জাতি।

লেখকঃ কলামিস্ট,সোস্যাল এক্টিভিস্ট,সম্পাদক-সকালের আলো ডট কম

The short URL of the present article is: https://www.nirapadnews.com/r37l
Notify of
guest
0 মন্তব্য
সবচেয়ে পুরাতন
সবচেয়ে নতুন Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Advertisements
সর্বশেষ
- Advertisements -
এ বিভাগে আরো দেখুন