গাজীপুরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের দুইপাশে জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন

- Advertisements -

লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল: ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক বাংলাদেশের অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ একটি যোগাযোগ পথ। রাজধানী ঢাকার সঙ্গে উত্তর-মধ্যাঞ্চলের জেলাগুলোর সংযোগ রক্ষার পাশাপাশি এটি শিল্প, কৃষি, বাণিজ্য এবং শ্রমিক চলাচলের প্রধান লাইফলাইন হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে গাজীপুর অংশে এই মহাসড়কটি প্রতিদিন লাখো মানুষের যাতায়াতের একমাত্র ভরসা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কের দুইপাশে বিভিন্ন জায়গায় দীর্ঘদিন ধরে যে জলাবদ্ধতার ভয়াবহ সমস্যা তৈরি হয়েছে, তা এখন আর সাধারণ নাগরিক দুর্ভোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি একটি জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে।

আজ বাস্তবতা হলো, সামান্য বৃষ্টিতেই গাজীপুর অংশের মহাসড়কের দুইপাশ পানিতে তলিয়ে যায়। কোথাও হাঁটু পানি, কোথাও কোমরসমান জল জমে থাকে দিনের পর দিন। ফলে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়, শ্রমজীবী মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হন, স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে এবং শিল্পাঞ্চলের উৎপাদন ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অথচ এই সমস্যাটি নতুন নয়, বছরের পর বছর ধরে একই চিত্র আমরা দেখছি, কিন্তু কার্যকর সমাধান আজও অনুপস্থিত।

গাজীপুরের এই জলাবদ্ধতার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দ্রুত শিল্পায়ন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে গাজীপুর এলাকায় বসতবাড়ি, শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে উঠেছে পরিকল্পনা ছাড়াই। প্রাকৃতিক জলাধার, খাল-বিল এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থা দখল ও ভরাট হয়ে গেছে।

ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতা, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের দুইপাশে পর্যাপ্ত ও কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। যেখানে ড্রেন আছে, সেগুলো অধিকাংশ সময় ময়লা, পলিথিন ও বর্জ্যে বন্ধ হয়ে যায়। নিয়মিত পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া, সড়ক সম্প্রসারণ ও অবকাঠামো উন্নয়নের সময় অনেক জায়গায় পানি চলাচলের প্রাকৃতিক পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে পানি জমে থেকে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে।

Advertisements

দায়িত্বশীল সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, সিটি করপোরেশন, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকায় সমস্যার সমাধান বারবার থেমে যাচ্ছে।

বর্ষাকালে গাজীপুরের মহাসড়কের দুইপাশে যে দৃশ্য দেখা যায়, তা অত্যন্ত করুণ ও উদ্বেগজনক। অফিসগামী মানুষদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে আটকে থাকতে হয়। অনেক সময় বাস, ট্রাক ও ব্যক্তিগত গাড়ি পানিতে আটকে যায়। ছোট যানবাহন যেমন রিকশা, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল প্রায় চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে।
শুধু যাতায়াত নয়, এই জলাবদ্ধতার কারণে আশপাশের দোকানপাট, বাসাবাড়ি এবং শিল্পকারখানাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক এলাকায় নোংরা পানি জমে দুর্গন্ধ ও মশার উপদ্রব বেড়ে যায়, যা ডেঙ্গু ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। ফলে এটি এখন আর শুধু পরিবহন সমস্যা নয়, এটি একটি স্বাস্থ্যঝুঁকি।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কটি গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে হাজারো গার্মেন্টস ও ছোট-বড় শিল্পকারখানা রয়েছে। প্রতিদিন লক্ষাধিক শ্রমিক এই সড়ক ব্যবহার করে কর্মস্থলে যাতায়াত করেন। জলাবদ্ধতার কারণে যানজট ও সময় নষ্ট হওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে পণ্য পরিবহনেও দেরি হচ্ছে, যার ফলে রপ্তানি ও অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই ক্ষতি শুধু ব্যক্তিগত নয়, জাতীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সমস্যার সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি কোনো কার্যকর পরিকল্পনা দেখা যায় না। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম এলে কিছু অস্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হয়, যেমন পানি সেচ দেওয়া বা সাময়িক ড্রেন পরিষ্কার করা। কিন্তু মৌলিক কাঠামোগত সংস্কার কখনোই করা হয় না। যখনই জলাবদ্ধতা ভয়াবহ আকার ধারণ করে, তখনই প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বাস আসে, কিন্তু কিছুদিন পর আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। এটি এক ধরনের চক্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে সমস্যা থাকে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান আসে না।

এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য এখনই কিছু বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। মহাসড়কের দুইপাশে আধুনিক ও কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শুধু ড্রেন নির্মাণ নয়, এর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিষ্কার নিশ্চিত করতে হবে। প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ পুনরুদ্ধার করতে হবে। যেসব খাল-বিল বা জলাধার দখল হয়ে গেছে, সেগুলো উদ্ধার করে পুনরায় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ করতে হবে এবং ভবিষ্যতে যেকোনো উন্নয়ন পরিকল্পনায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে হবে। সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। একটি একক সমন্বিত টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে, যারা এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানে কাজ করবে। প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে কোথায় পানি জমছে এবং কেন জমছে তা দ্রুত শনাক্ত করা যায়।

Advertisements

শুধু সরকার বা প্রশাসন নয়, সাধারণ মানুষেরও এখানে দায়িত্ব আছে। অনেক সময় দেখা যায়, ড্রেনে প্লাস্টিক, ময়লা ও বর্জ্য ফেলা হয়, যা জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ। নাগরিক সচেতনতা ছাড়া কোনো পরিকল্পনাই সফল হতে পারে না। স্থানীয় জনগণকে এই বিষয়ে সচেতন করতে হবে এবং সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে যাতে সবাই পরিবেশ রক্ষায় দায়িত্বশীল হয়।

গাজীপুরের ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের দুইপাশে জলাবদ্ধতা এখন আর সাধারণ সমস্যা নয়, এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী অব্যবস্থাপনার প্রতিচ্ছবি। বছরের পর বছর ধরে একই সমস্যা চলতে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এখনই সময় দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং পরিকল্পিত উদ্যোগের মাধ্যমে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান করা। কারণ একটি আধুনিক রাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক বর্ষায় পানির নিচে তলিয়ে যাবে, এটি শুধু দুর্ভাগ্য নয়, এটি উন্নয়ন ব্যবস্থার ব্যর্থতাও নির্দেশ করে।
জলাবদ্ধতা নিরসনে গাজীপুরের শ্রীপুরে সড়ক ও জনপদের (সওজ) জায়গায় গড়ে উঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নির্দেশ দিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য (গাজীপুর-৩) অধ্যাপক ডা. রফিকুল ইসলাম বাচ্চু। জলাবদ্ধতা নিরসনে করণীয় নির্ধারণে মহাসড়ক পরিদর্শনে এসে সড়ক জনপদ বিভাগের কর্মকর্তাদের এ নির্দেশ দেন তিনি। ৩ মে (রবিবার) দুপুরে উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের মুলাইদ গ্রামের রঙিলা বাজার এলাকা পরিদর্শন করেন তিনি। এ সময় বিভন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা তার সাথে ছিলেন। সওজ এর গাজীপুর নির্বাহী প্রকৌশলী তানভীর আহমেদ বলেন, মহাসড়কের রঙিলা বাজার এলাকায় পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় বৃষ্টির পানি জমে দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়। ৩ মে (রবিবার) স্থানীয় সংসদ সদস্য (গাজীপুর-৩) বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের নিয়ে বেশ কয়েকটি পয়েন্ট পরিদর্শন করেন। তিনি মহাসড়কের পাশে গড়ে উঠা সব অবৈধ স্থাপনা এমনকি দলীয় অফিস থাকলেও সরানোর নির্দেশ দেন। গাজীপুরের সকল সংসদ সদস্য, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বর্ষাকাল শুরু হওয়ার পূর্বেই জলাবদ্ধতা নিরসনের প্রয়জনীয় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে সচেষ্ট হতে হবে। এই বিষয়ে সড়ক ব্যবহারকারী সকলকেও সচেতন হতে হবে।

গাজীপুরের এই জলাবদ্ধতা নিরসনের দ্রুত সমাধান না হলে আগামী দিনে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ হবে। তাই এখনই জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

লেখক পরিচিতি:
লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল
(শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক)
যুগ্মমহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) কেন্দ্রীয় কমিটি
৭০ কাকরাইল, ঢাকা।

The short URL of the present article is: https://www.nirapadnews.com/p41r
Notify of
guest
0 মন্তব্য
সবচেয়ে পুরাতন
সবচেয়ে নতুন Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Advertisements
সর্বশেষ
- Advertisements -
এ বিভাগে আরো দেখুন