পিতা-মাতার ভরণপোষণ সন্তানের ধর্মীয় আইনি নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব

- Advertisements -

লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল: মানুষের জীবনে এমন দুটি শব্দ রয়েছে, যার গভীরতা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। সেই দুটি শব্দ হলো মা ও বাবা। পৃথিবীর সব সম্পর্কের মধ্যে এই সম্পর্কই সবচেয়ে পবিত্র, সবচেয়ে নিঃস্বার্থ এবং সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য। একজন সন্তান পৃথিবীতে আসার বহু আগে থেকেই তাঁর জন্য স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন তাঁর পিতা-মাতা। একজন মা দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধারণ করেন, মৃত্যুযন্ত্রণার মতো কষ্ট সহ্য করে সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখান। জন্মের পর নিজের ক্ষুধা, ঘুম, স্বাচ্ছন্দ্য এবং ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়াকে বিসর্জন দিয়ে সন্তানের লালন-পালনে নিজেকে উৎসর্গ করেন। অন্যদিকে একজন বাবা সংসারের হাজারো কষ্ট, দুশ্চিন্তা ও সংগ্রাম নিজের বুকে লুকিয়ে রেখে সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য নিরলস পরিশ্রম করেন। তাঁদের কাছে নিজের সুখের চেয়ে সন্তানের সুখই বড়, নিজের ভবিষ্যতের চেয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎই অধিক মূল্যবান।

কিন্তু অত্যন্ত বেদনাদায়ক হলেও সত্য, সেই পিতা-মাতাই আজ অনেক ক্ষেত্রে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। যাঁদের হাত ধরে একজন সন্তান হাঁটতে শিখেছে, কথা বলতে শিখেছে, জীবনের প্রতিটি ধাপ অতিক্রম করেছে, সেই হাতই বার্ধক্যে এসে অনেক সময় অসহায়ভাবে সাহায্যের জন্য প্রসারিত থাকে। অথচ সেই হাত ধরার মতো সময় কিংবা মানসিকতা অনেক সন্তানের থাকে না। এটি কেবল একটি পারিবারিক সংকট নয়, বরং আমাদের নৈতিকতা, মানবিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধের গভীর অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি।

সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরে এক বৃদ্ধা মায়ের মৃত্যুর ঘটনা গোটা দেশকে ব্যথিত করেছে। চারজন সন্তান সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত থাকা সত্ত্বেও শেষ জীবনে তিনি যথাযথ যত্ন ও সেবার অভাবে মানবেতর জীবন কাটিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। মৃত্যুর পর দীর্ঘ সময় তাঁর মরদেহ পড়ে থাকার খবর মানুষকে শুধু শোকাহত করেনি, বরং বিবেককে নাড়া দিয়েছে। ঘটনাটি আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে, আমরা কি সত্যিই আমাদের পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব পালন করছি, নাকি শুধু সামাজিক পরিচয়ের আড়ালে নিজেদের দায়িত্বহীনতাকে লুকিয়ে রাখছি?

তবে এই লেখার উদ্দেশ্য কোনো একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবেগ সৃষ্টি করা নয়। বরং সেই ঘটনাকে উপলক্ষ করে একটি বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতা তুলে ধরা। কারণ মিরপুরের সেই মা একা নন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হাজার হাজার পিতা-মাতা আজ নীরবে একই কষ্ট বয়ে বেড়াচ্ছেন। কেউ অর্থের অভাবে নয়, সন্তানের ভালোবাসার অভাবে কষ্ট পাচ্ছেন। কেউ ওষুধের অভাবে নয়, একটি আন্তরিক খোঁজখবরের অভাবে নিঃসঙ্গ জীবন কাটাচ্ছেন। তাঁদের আর্তনাদ সংবাদপত্রের শিরোনাম হয় না, কিন্তু প্রতিদিন অসংখ্য পরিবারে নীরবে এই মানবিক বিপর্যয় ঘটে চলেছে।

অনেকেই মনে করেন, পিতা-মাতার দেখাশোনা করা বা তাঁদের খরচ বহন করা সন্তানের দয়া বা অনুগ্রহ। এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। পিতা-মাতার ভরণপোষণ কোনো দান নয়, এটি তাঁদের ন্যায্য অধিকার। সন্তান হিসেবে এই দায়িত্ব পালন করা কোনো উপকার নয়, বরং একটি অপরিহার্য কর্তব্য। যে মা-বাবা নিজের সর্বস্ব দিয়ে সন্তানকে মানুষ করেছেন, তাঁদের বার্ধক্যে সম্মান, নিরাপত্তা, চিকিৎসা, খাদ্য, বাসস্থান এবং মানসিক প্রশান্তি নিশ্চিত করা সন্তানের স্বাভাবিক দায়িত্ব। একজন বৃদ্ধ পিতা কিংবা মায়ের সবচেয়ে বড় চাহিদা সব সময় অর্থ নয়। তাঁরা চান সন্তান একটু পাশে বসুক, দুই মিনিট কথা বলুক, খোঁজ নিক, অসুস্থ হলে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাক, প্রয়োজনে হাত ধরে হাঁটুক। এই ছোট ছোট বিষয়গুলোই তাঁদের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

ইসলাম এমন একটি জীবনব্যবস্থা, যেখানে পিতা-মাতার মর্যাদাকে অত্যন্ত উচ্চ স্থানে অধিষ্ঠিত করা হয়েছে। মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে নিজের ইবাদতের নির্দেশ দেওয়ার পরপরই পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। এটি প্রমাণ করে, একজন মানুষের ঈমান ও চরিত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হলো পিতা-মাতার প্রতি তার আচরণ। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তোমার প্রতিপালক আদেশ করেছেন, তোমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে এবং পিতা-মাতার সঙ্গে উত্তম আচরণ করবে। তাঁদের একজন অথবা উভয়েই যদি বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তাঁদের উদ্দেশে ‘উহ’ পর্যন্ত বলবে না, ধমক দেবে না বরং সম্মানের সঙ্গে কথা বলবে’। এই আয়াত শুধু ভদ্র আচরণের শিক্ষা দেয় না, বরং বার্ধক্যে পিতা-মাতার প্রতি অতিরিক্ত ধৈর্য, সহানুভূতি ও দায়িত্বশীলতার নির্দেশ দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মায়ের পদতলে সন্তানের জান্নাত’।
আরেকটি হাদিসে এসেছে, ‘আল্লাহর সন্তুষ্টি পিতার সন্তুষ্টির মধ্যে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি পিতার অসন্তুষ্টির মধ্যে’।
এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, পিতা-মাতার সেবা শুধু একটি সামাজিক কাজ নয়, এটি ইবাদত। তাঁদের ভরণপোষণ করা কেবল নৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম মাধ্যম।

আজ আমাদের সমাজে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে, অর্থনৈতিক সক্ষমতা বেড়েছে, প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে বেড়েছে আত্মকেন্দ্রিকতা, ভোগবাদ এবং পারিবারিক দূরত্ব। আমরা সন্তানের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করছি, কিন্তু মানবিক শিক্ষা কতটা দিচ্ছি? আমরা সন্তানকে সফল হওয়ার শিক্ষা দিচ্ছি, কিন্তু কৃতজ্ঞ হওয়ার শিক্ষা কি দিচ্ছি? আজকের শিশু যদি দেখে তার বাবা নিজের বৃদ্ধ বাবার সঙ্গে রূঢ় আচরণ করছেন, তবে সেই শিশু বড় হয়ে একই আচরণ করবে। কারণ মূল্যবোধ মুখে শেখানো যায় না, তা শেখানো হয় আচরণের মাধ্যমে। যে পরিবারে পিতা-মাতাকে সম্মান করা হয়, সেই পরিবারে সন্তানরাও মানবিক হয়ে বেড়ে ওঠে। আর যেখানে বৃদ্ধ মা-বাবাকে অবহেলা করা হয়, সেখানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও একই অবক্ষয়ের ধারক হয়ে ওঠে। এই কারণেই পিতা-মাতার ভরণপোষণ কেবল ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটি একটি জাতির নৈতিক শক্তির মানদণ্ড।

Advertisements

অনেকেই মনে করেন, পিতা-মাতার ভরণপোষণ সম্পূর্ণ পারিবারিক বিষয়। সন্তান চাইলে করবে, না চাইলে করবে না। কিন্তু এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। বাংলাদেশ রাষ্ট্রও পিতা-মাতার ভরণপোষণকে একটি মৌলিক পারিবারিক দায়িত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং এ বিষয়ে আইন প্রণয়ন করেছে। ২০১৩ সালে ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন’ প্রণয়নের মাধ্যমে রাষ্ট্র স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে যে, আর্থিকভাবে সক্ষম প্রত্যেক সন্তানের ওপর তাঁর পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করার আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য শুধু খাদ্য বা অর্থের ব্যবস্থা করা নয়, বরং প্রবীণ পিতা-মাতার জন্য সম্মানজনক, নিরাপদ ও মানবিক জীবন নিশ্চিত করা।
আইন অনুযায়ী সন্তানের দায়িত্ব হলো, পিতা-মাতার খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, তাঁদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া, কোনো অবস্থায় তাঁদের অসহায় অবস্থায় ফেলে না রাখা ও অন্য ভাই-বোনের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে নিজের কর্তব্য থেকে সরে না দাঁড়ানো। আইন প্রণয়ন করা হয়েছে বলেই সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে, বিষয়টি এমন নয়। বরং আইনটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, যে দায়িত্ব অনেকের বিবেক থেকে হারিয়ে গেছে, রাষ্ট্র সেটিকে আইনের মাধ্যমে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করতে বাধ্য হয়েছে। একটি সভ্য সমাজে সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, যে দায়িত্ব ভালোবাসা থেকে পালন করার কথা, সেটি আইনের ভয় দেখিয়ে আদায় করতে হয়।

আদালত একজন সন্তানকে ভরণপোষণের টাকা দিতে বাধ্য করতে পারে। কিন্তু আদালত কি একজন মায়ের প্রতি সন্তানের ভালোবাসা ফিরিয়ে দিতে পারে? আদালত রায় দিতে পারে, কিন্তু মায়ের কপালে সন্তানের স্নেহের হাত রাখতে পারে না। বিচারক শাস্তি দিতে পারেন, কিন্তু একজন বৃদ্ধ বাবার নিঃসঙ্গ বিকেলগুলো পূরণ করতে পারেন না। এই কারণেই আইন প্রয়োজন, কিন্তু আইনের চেয়েও বেশি প্রয়োজন বিবেক। যেখানে বিবেক জাগ্রত থাকে, সেখানে মামলা হয় না। আদালতের দরজায় কড়া নাড়তে হয় না। সেখানে সন্তান নিজেই বুঝে নেয়, মা-বাবার মুখের হাসিই তার সবচেয়ে বড় অর্জন।

একসময় আমাদের সমাজে যৌথ পরিবার ছিল। একই ছাদের নিচে দাদা-দাদি, নানা-নানি, চাচা-চাচি, ভাই-বোন সবাই একসঙ্গে বসবাস করতেন। প্রবীণরা ছিলেন পরিবারের অভিভাবক, সিদ্ধান্তদাতা ও আশীর্বাদস্বরূপ।
আজ সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। পারমাণবিক পরিবার, কর্মব্যস্ত জীবন, ভোগবাদী মানসিকতা এবং আত্মকেন্দ্রিক চিন্তাধারা অনেক পরিবারকে প্রবীণদের থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। অনেক বৃদ্ধ মা-বাবা সন্তানদের একই শহরে থেকেও মাসের পর মাস তাঁদের মুখ দেখতে পান না। কেউ কেউ সন্তানের বাড়িতে থেকেও নিজেকে অতিথি মনে করেন। আবার অনেকে সন্তানদের সংসারে নিজের উপস্থিতিকে বোঝা বলে ভাবতে শুরু করেন। এটি শুধু একটি সামাজিক পরিবর্তন নয়, এটি গভীর মানবিক সংকট।

বাংলাদেশে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা আগের তুলনায় বেড়েছে। সব বৃদ্ধাশ্রম খারাপ নয়। এমন অনেক প্রবীণ আছেন যাঁদের কোনো সন্তান নেই বা যাঁরা বিশেষ পরিস্থিতিতে সেখানে আশ্রয় নেন। কিন্তু যখন সন্তান থাকা সত্ত্বেও একজন পিতা বা মাকে বৃদ্ধাশ্রমে দিন কাটাতে হয়, তখন সেটি শুধু একটি পারিবারিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি আমাদের সামাজিক ব্যর্থতার প্রতীক। একজন মা কি কখনো তাঁর সন্তানকে এতিমখানায় রেখে নিশ্চিন্তে জীবন কাটিয়েছিলেন? তাহলে একজন সন্তান কীভাবে নিজের জন্মদাতা পিতা-মাতাকে একাকীত্বের মধ্যে রেখে স্বস্তিতে থাকতে পারেন? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু আইনের কাছে নয়, সমাজের প্রতিটি বিবেকবান মানুষের কাছেও চাওয়া উচিত।

রাজধানীর মিরপুরে ঘটে যাওয়া বৃদ্ধা মায়ের মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, শুধু শিক্ষিত হলেই মানুষ হওয়া যায় না, শুধু প্রতিষ্ঠিত হলেই দায়িত্বশীল হওয়া যায় না। চারজন সন্তান সমাজে প্রতিষ্ঠিত। অথচ জন্মদাত্রী মা জীবনের শেষ সময়ে অবহেলার শিকার। এই ঘটনাটি আমাদের শেখায়, অর্থনৈতিক সাফল্য কখনোই মানবিকতার বিকল্প হতে পারে না। আমরা প্রায়ই সন্তানদের ভালো স্কুলে ভর্তি করাই, উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠাই, বড় চাকরি পাওয়ার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করি। কিন্তু তাঁদের কি শেখাই যে, বৃদ্ধ মা-বাবার হাত ধরে হাঁটানোও জীবনের একটি বড় দায়িত্ব? যে শিক্ষা মানুষকে কৃতজ্ঞ হতে শেখায় না, সে শিক্ষা অসম্পূর্ণ।
যে সাফল্য মানুষকে নিজের জন্মদাতার প্রতি দায়িত্বশীল করে না, সে সাফল্য প্রশ্নবিদ্ধ। মিরপুরের সেই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের ব্যর্থতা নয়, এটি আমাদের সময়ের একটি নির্মম প্রতিচ্ছবি। আজ যদি আমরা এই ঘটনাকে শুধুই সংবাদ হিসেবে পড়ে ভুলে যাই, তাহলে আগামীকাল আরও অসংখ্য মা-বাবা একই পরিণতির শিকার হবেন।

আমরা অনেক সময় প্রতিবেশীর বাড়িতে বৃদ্ধ মা-বাবার প্রতি অবহেলা দেখতে পাই। আত্মীয়স্বজনের মধ্যেও এমন ঘটনা ঘটে। কিন্তু খুব কম মানুষই প্রতিবাদ করেন। এই নীরবতা অন্যায়কে আরও শক্তিশালী করে।পিতা-মাতার প্রতি নির্যাতন, অবহেলা বা ভরণপোষণ থেকে বঞ্চিত করা শুধু পারিবারিক বিষয় নয়, এটি একটি সামাজিক অন্যায়। অন্যায় দেখেও নীরব থাকা সমাজকে আরও নিষ্ঠুর করে তোলে। তাই পরিবার, আত্মীয়স্বজন, সামাজিক সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যম সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। পিতা-মাতার অধিকার রক্ষায় সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলা আজ সময়ের দাবি। আজ আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা কেমন সমাজ রেখে যেতে চাই? এমন একটি সমাজ, যেখানে বৃদ্ধ মা-বাবা সন্তানের অপেক্ষায় জানালার পাশে বসে থাকবেন, নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে বার্ধক্য হবে সম্মান, নিরাপত্তা ও ভালোবাসার আরেকটি নাম?

পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু সন্তানের নয় বরং পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং প্রতিটি নাগরিকেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। একটি মানবিক সমাজ গড়তে হলে আমাদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। পরিবার থেকেই মূল্যবোধের শিক্ষা শুরু করতে হবে। শিশুকে শুধু ভালো ফলাফল অর্জনের শিক্ষা দিলেই হবে না, তাকে কৃতজ্ঞতা, শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ এবং মানবিকতার শিক্ষাও দিতে হবে। সে যেন ছোটবেলা থেকেই বুঝতে শেখে, মা-বাবার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা কোনো অনুগ্রহ নয়, বরং এটি একজন মানুষের সর্বোচ্চ নৈতিক পরিচয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষা আরও কার্যকর করতে হবে। পাঠ্যপুস্তকে পিতা-মাতার অধিকার, প্রবীণদের মর্যাদা এবং পারিবারিক দায়িত্ব নিয়ে বাস্তবধর্মী আলোচনা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। শুধু পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার শিক্ষা নয়, মানুষ হওয়ার শিক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা আরও জোরদার করতে হবে। মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও প্যাগোডায় ধর্মীয় আলোচনায় নিয়মিতভাবে পিতা-মাতার অধিকার ও সন্তানের দায়িত্ব নিয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করা উচিত। ধর্ম কখনোই পিতা-মাতার অবহেলাকে সমর্থন করে না। রাষ্ট্রকে বিদ্যমান আইন আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩’ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতা এখনও যথেষ্ট নয়। অনেক পিতা-মাতা জানেনই না যে, তাঁরা আইনগতভাবে ভরণপোষণ দাবি করার অধিকার রাখেন। তাই প্রচার-প্রচারণা, আইনি সহায়তা এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। সামাজিক সংগঠন ও গণমাধ্যমকে এগিয়ে আসতে হবে। প্রবীণদের অধিকার নিয়ে নিয়মিত প্রচারণা, সচেতনতামূলক কর্মসূচি এবং ইতিবাচক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। যে সমাজে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষ কথা বলে, সেই সমাজেই পরিবর্তন আসে।

Advertisements

আপনি যদি আজ কর্মজীবনে সফল হন, সমাজে সম্মানিত হন, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হন, তাহলে একটু থেমে নিজেকে প্রশ্ন করুন। শেষ কবে মায়ের পাশে বসে গল্প করেছেন? শেষ কবে বাবার হাত ধরে হেঁটেছেন?
শেষ কবে তাঁদের চিকিৎসার খবর নিয়েছেন? শেষ কবে তাঁদের চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছেন, ‘আপনারা আছেন বলেই আমি আজ এই অবস্থানে’। অনেক সময় আমরা মনে করি, টাকা পাঠিয়ে দায়িত্ব শেষ। বাস্তবতা হলো, বৃদ্ধ পিতা-মাতার সবচেয়ে বড় চাহিদা অর্থ নয়, সন্তানের সময়, ভালোবাসা, সম্মান এবং আন্তরিকতা।
একদিন যে মা আপনার হাত ধরে স্কুলে নিয়ে গেছেন, আজ তাঁর হাত কাঁপে। একদিন যে বাবা আপনাকে কাঁধে তুলে পথ চলেছেন, আজ তিনিই হয়তো সিঁড়ি ভাঙতে আপনার হাতের অপেক্ষায় থাকেন। জীবনের এই চক্রকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আজ আপনি সন্তান, কাল আপনিও পিতা বা মাতা হবেন। আজ আপনার মা-বাবার সঙ্গে আপনার আচরণই আগামী দিনে আপনার সন্তানের আচরণের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে কোনো মা-বাবাকে নিজের সন্তানের কাছে অবহেলিত হতে হবে না। আমরা এমন একটি পরিবার চাই, যেখানে বার্ধক্যকে বোঝা নয়, অভিজ্ঞতার সম্পদ হিসেবে দেখা হবে। আমরা এমন একটি প্রজন্ম চাই, যারা প্রযুক্তিতে আধুনিক হওয়ার পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধেও সমৃদ্ধ হবে। আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে বৃদ্ধাশ্রম নয়, প্রতিটি সন্তানের ঘরই হবে পিতা-মাতার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।

পিতা-মাতা পৃথিবীতে আল্লাহর দেওয়া সবচেয়ে বড় নিয়ামত। তাঁদের ঋণ কোনো দিন শোধ করা সম্ভব নয়। কারণ সন্তানের জন্য তাঁদের যে ত্যাগ, যে ভালোবাসা এবং যে আত্মনিবেদন, তার কোনো তুলনা হয় না। আজ যদি আমরা তাঁদের বার্ধক্যে পাশে না দাঁড়াই, তবে শুধু একজন মানুষ হিসেবে নয়, একজন সন্তান হিসেবেও আমরা ব্যর্থ হব। ধর্ম আমাদের এই দায়িত্ব দিয়েছে, আইন আমাদের বাধ্য করেছে, নৈতিকতা আমাদের আহ্বান জানিয়েছে এবং সমাজ আমাদের কাছে এই প্রত্যাশাই করে। মিরপুরের সেই মায়ের মৃত্যু আমাদের জন্য একটি নির্মম শিক্ষা। এই ঘটনা যেন আর কোনো পরিবারের ভাগ্যে না ঘটে। কোনো মা যেন সন্তানের অবহেলায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ না করেন। কোনো বাবা যেন নিজের সন্তানদের কাছে অবাঞ্ছিত হয়ে না বাঁচেন। আজ আমাদের প্রত্যেকের প্রতিজ্ঞা হওয়া উচিত, পিতা-মাতার ভরণপোষণকে দয়া বা অনুগ্রহ নয়, তাঁদের প্রাপ্য অধিকার হিসেবে নিশ্চিত করব। মনে রাখতে হবে, মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার সম্পদ, পদ বা ক্ষমতায় নয়, বরং সে তার বৃদ্ধ পিতা-মাতার সঙ্গে কেমন আচরণ করে, তার মধ্যেই তার প্রকৃত মানবিক পরিচয় নিহিত থাকে।

একটি জাতির সভ্যতা পরিমাপ করা যায় না শুধু উন্নয়নের পরিসংখ্যান দিয়ে। সেই জাতির প্রকৃত সভ্যতা প্রতিফলিত হয় তার প্রবীণদের মুখের হাসিতে, তাদের নিরাপত্তায় এবং তাদের সম্মানজনক জীবনে। তাই আসুন, আমরা এমন একটি সমাজ গড়ে তুলি, যেখানে পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইনের ভয়ে নয়, ভালোবাসার টানে নিশ্চিত হবে, যেখানে কোনো মা সন্তানের অপেক্ষায় নিরাশ হবেন না, কোনো বাবা নিঃসঙ্গতার অন্ধকারে হারিয়ে যাবেন না। কারণ পিতা-মাতার দোয়াই সন্তানের জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ, আর তাঁদের সন্তুষ্টিতেই সৃষ্টিকর্তা সন্তুষ্ট হয়। পিতা-মাতার ভরণপোষণ সন্তানের ধর্মীয়, আইনি, নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব। একটি মানবিক, সুন্দর ও কল্যাণময় সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পিতা-মাতাসহ প্রবীণদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক পরিচিতি:
লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল
(শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক)
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি (কৃষি) কেন্দ্রীয় কমিটি
যুগ্মমহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) কেন্দ্রীয় কমিটি
৭০ কাকরাইল, ঢাকা।

The short URL of the present article is: https://www.nirapadnews.com/nqd2
Notify of
guest
0 মন্তব্য
সবচেয়ে পুরাতন
সবচেয়ে নতুন Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Advertisements
সর্বশেষ
- Advertisements -
এ বিভাগে আরো দেখুন