পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে দেশের পশুর হাটগুলোতে এক শ্রেণীর অসাধু খামারি ও ব্যবসায়ী অধিক মুনাফা লোটার প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠেন। তারা সম্পূর্ণ অনৈতিক ও অস্বাস্থ্যকর উপায়ে পশুকে দ্রুত মোটাতাজা করার জন্য বিভিন্ন ক্ষতিকর স্টেরয়েড, হরমোন ইনজেকশন এবং অতিরিক্ত মাত্রায় ইউরিয়া সার খাইয়ে থাকেন। গবেষক ও চিকিৎসকদের মতে, এভাবে কৃত্রিম উপায়ে মোটাতাজা করা পশুর মাংস মানবদেহের জন্য চরম ক্ষতিকর। এই মাংস নিয়মিত খেলে মানুষের স্তন, কোলন, প্রোস্টেট এবং ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়।
অতিরিক্ত ইউরিয়া সেবনের ফলে পশুর অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেমন লিভার, কিডনি এবং মস্তিষ্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে পশুটি প্রাকৃতিকভাবে বেঁচে থাকার স্বাভাবিক শক্তি হারিয়ে ফেলে এবং অনেক সময় হাটে আনার পরপরই আকস্মিক মারা যায়। বিশেষজ্ঞরা এই ধরনের কৃত্রিমভাবে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তোলা পশুকে ‘বিষাক্ত গরু’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এই বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত গরুর মাংস মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে কিডনি বিকল বা ড্যামেজ হওয়ার মতো ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দেয়।
পশু চিকিৎসায় হরমোন ও রাসায়নিক ব্যবহারের ইতিহাস বেশ পুরনো এবং বিতর্কিত। বিগত সত্তরের দশকে গরুর মাংসে ব্যবহৃত ‘ডাই ইথাইলস্টিলবেস্টেরল’ নামক একটি হরমোন উপাদানের সাথে নারীদের যোনীপথের ক্যানসারের এবং পরবর্তীতে ইস্ট্রোজেনের সাথে স্তন ক্যানসারের সরাসরি যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়, যার ফলে এটি বিশ্বব্যাপী নিষিদ্ধ করা হয়। এরপর ১৯৯৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দুধ ও মাংসের উৎপাদন বাড়াতে ‘বোভাইন সোমাটোট্রপিন (বিএসটি)’ নামক হরমোন অনুমোদন পেলেও স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও কানাডাসহ বিশ্বের অনেক দেশ তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে। এই ধরনের কৃত্রিম হরমোন ব্যবহারের ফলে গরুর শরীরে বিভিন্ন সংক্রমণ বা ইনফেকশন অনেকাংশে বেড়ে যায়। আর এই সংক্রমণ নিরাময়ের জন্য পশুকে উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক দিতে হয়, যার ক্ষতিকর উচ্ছিষ্ট অংশ মাংসের ভেতরেই থেকে যায়। পরবর্তীতে এই মাংস খাওয়ার মাধ্যমে মানুষের শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের মতো জটিল ও চিকিৎসাতীত সমস্যা তৈরি হয়।
হাটে গিয়ে সাধারণ ক্রেতারা যেন প্রতারিত না হন এবং ক্ষতিকর পশু কেনা থেকে বিরত থাকতে পারেন, সেজন্য গবেষকেরা সহজ কিছু চাক্ষুষ ও শারীরিক লক্ষণ প্রকাশ করেছেন। একটু সতর্ক হলেই এই বিষাক্ত গরুগুলো চেনা সম্ভব:
পশুর শরীরে বা পেছনের রানের মাংসল অংশে আঙুল দিয়ে জোরে চাপ দিলে যদি সেই জায়গাটি দেবে যায় এবং চামড়া আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে দীর্ঘ সময় নেয়, তবে বুঝতে হবে এটি কৃত্রিম উপায়ে মোটাতাজা করা। কারণ, একটি সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক পশুর রানের মাংস বেশ শক্ত ও আঁটসাঁট হয় এবং আঙুলের চাপের পর তা দ্রুত স্বস্থানে ফিরে আসে।
শারীরিক আচরণের দিক থেকে একটি সুস্থ পশু সবসময় চটপটে, চঞ্চল এবং চারপাশের পরিবেশ নিয়ে সতর্ক থাকে। এর বিপরীতে, হরমোন বা ওষুধ খাওয়ানো পশু অত্যন্ত নিস্তেজ ও শান্ত থাকে। অতিরিক্ত রাসায়নিকের কারণে শরীরে পানি জমার ফলে এরা নড়াচড়া করতে কষ্ট পায় এবং এক জায়গায় দাঁড়িয়ে অনবরত ঝিমাতে থাকে।
কৃত্রিম উপায়ে মোটা করা পশুর ফুসফুস ও হৃদযন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে, যার ফলে এরা খুব দ্রুত এবং ঘন ঘন শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়। সামান্য হাঁটাচলা করলেই এরা হাঁপাতে শুরু করে এবং শ্বাস নেওয়ার সময় ভেতর থেকে এক ধরণের স্পষ্ট শব্দ শোনা যায়।
সুস্থ পশুর নাকের উপরিভাগ সবসময় কিছুটা ভেজা বা আর্দ্র থাকে এবং মুখের সামনে কোনো খাবার ধরলে তারা নিজে থেকে জিব বাড়িয়ে তা টেনে খাওয়ার চেষ্টা করে। অপরদিকে, রাসায়নিকযুক্ত অসুস্থ পশুর মুখ থেকে অতিরিক্ত লালা বা ফেনা ঝরতে দেখা যায় এবং এদের মুখমণ্ডল ও পা স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত ফোলা বা থলথলে দেখায়।
যদি পশুর শরীরে হাত দিয়ে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি অর্থাৎ জ্বরের মতো অনুভূত হয়, তবে ধরে নিতে হবে পশুটি কোনো না কোনো শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছে।
বাহ্যিক গঠনের ক্ষেত্রে যেসব পশুর চামড়া কিছুটা উষ্কখুষ্ক ও স্বাভাবিক, পিঠের কুঁজটি বেশ মোটা ও টানটান এবং চামড়ার ওপর দিয়ে পাঁজরের দু-একটি হাড় হালকা বোঝা যায়, সেগুলোই মূলত কোনো কৃত্রিম রাসায়নিক ছাড়াই বাজারে আসা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে বড় হওয়া সুস্থ পশু।
রাতের কৃত্রিম আলোয় পশুর এই শারীরিক লক্ষণগুলো, বিশেষ করে গায়ের রঙ, চোখের অবস্থা কিংবা ঝিমুনি ভাব নিখুঁতভাবে যাচাই করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। তাই নিজের ও পরিবারের স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা চিন্তা করে সবসময় দিনের আলো থাকতে থাকতেই হাটে গিয়ে কোরবানির পশু কেনা বুদ্ধিমানের কাজ।
