এ কে আজাদ: লোকমান হোসেন ফকির। গীতিকার, সুরকার, গায়ক ও চলচ্চিত্র প্রযোজক। তিনি মূলত লোকসঙ্গীত-এ পারদর্শি হলেও সব ধরণের গানই করেছেন। পল্লীপ্রকৃতি, জনজীবন ও লোকসংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে তিনি অনেক রচনা করেছেন। পল্লী বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছাড়াও তাঁর গানে পারিবারিক ও সামাজিক সম্প্রীতি, সম্পর্কের জটিলতা, প্রেম-বিরহ ও প্রণয়ঘটিত ব্যাপার স্যাপার ফুটে উঠেছে।
বেতার-টেলিভিশন ছাড়াও গান করেছেন চলচ্চিত্রেও। তাঁর সৃষ্ট অনেক গানই হয়েছে জনপ্রিয়, পেয়েছে কালজয়ীর মর্যাদা। লোকমান হোসেন ফকির রচিত ও সুরারোপিত “আবার জমবে মেলা, বটতলা হাটখোলা” গানটি তুমূল জনপ্রিয় একটি গান। কালজয়ী গানটি আজও ব্যাপকভাবে সমাদৃত। দেশের স্বাধিকার আন্দোলনে তাঁর কবিতা, গান ও সুর অনেক প্রেরণা জুগিয়েছে আমাদের ।
এই গুণী সঙ্গীতজ্ঞ লোকমান হোসেন ফকিরের মৃত্যুবার্ষিকী আজ। তিনি ১৯৯১ সালের ২৩ এপ্রিল, ঢাকায় নিজ বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৭ বছর। গুণী এই সঙ্গীতশিল্পীর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই। তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।
লোকমান হোসেন ফকির ১৯৩৪ সালের ২২ অক্টোবর, টাঙ্গাইল জেলার ভুয়াপুরের নিকরাইল গ্রামে, জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আলহাজ মমতাজ উদ্দিন ফকির ও মাতা কছিরন বেগম।
লোকমান হোসেন ফকির প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তারপর পলশিয়া রানী দিনমণি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। সিরাজগঞ্জ বি এল কলেজ থেকে আই এ পাস করে ভর্তি হন ময়মনসিংহ আনন্দ মোহন কলেজে। এখানে কিছুদিন পড়াশুনার পর কর্মমুখী হয়ে পড়েন এবং লেখাপড়ার ইতি ঘটে।
গাঁয়ের উদার প্রকৃতি, জনজীবন ও ধর্মীয় আবহে কাটতো তার শৈশবের দিনগুলো। পাড়াগাঁয়ে লেখাপড়া, খেলাধূলা, গান বাজনা, যাত্রা-নাটক, গ্রামবাংলার জারি সারি ভাটিয়ালি সুরের মাঝখানে লালিত হওয়া লোকমান হোসেন ফকির ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন । নিজ বাড়িতেও ছিল সঙ্গীত পরিমন্ডল। তাঁর দাদীর ছিল সুরেলা কন্ঠ। সঙ্গীতে হাতে খড়ি তাঁর কাছেই। চাচা, বাবা-মা এবং বড় ভাই প্রত্যেকেই ছিলেন সঙ্গীতপিপাসু। পরিবারের উৎসাহেই নিজেকে সঙ্গীত সাধনায় ন্যস্ত করেন।
একসময় কণ্ঠশিল্পী-গীতিকার ও সুরকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।
লোকমান হোসেন ফকির ১৯৬০ সালে, বেতারে কণ্ঠশিল্পী হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে ১৯৬৫ সালে, বেতার ও টেলিভিশনে গীতিকার ও সুরকার হিসেবে কাজ করেন।
তিনি বেতার-টেলিভিশন ছাড়াও কাজ করেছেন চলচ্চিত্রের জন্যও। ‘মলুয়া’ ছবির গীতিকার, সংগীত পরিচালক এবং প্রযোজক ও কণ্ঠশিল্পী । গান লিখেছে ‘ঘূর্ণিঝড়’ ছবির জন্য। ‘চরিত্রহীন’ ছবির সহযোগী সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন। ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ চলচ্চিত্রের পরিবেশনার সংগেও জড়িত ছিলেন লোকমান হোসেন ফকির।
তার কয়েকটি কালজয়ী গান ‘আবার জমবে মেলা বটতলা হাটখোলা’, ‘পতাকায় বাঁধা লাল সূর্যটা’, ‘আমায় একটি সাদা মানুষ দাও-যার রক্ত সাদা’ প্রভৃতি।
উপমহাদেশের খ্যাতিমান সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী ভুপেন হাজারিকা ও ঊষা মুঙ্গেশকর, লোকমান ফকিরের কয়েকটি গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। বিশেষ করে ‘আমায় একটি সাদা মানুষ দাও যার রক্ত সাদা’ লোকমান ফকিরের কথা ও সুরে ভুপেন হাজারিকার গাওয়া এই গানটি বিশ্বের সাতটি ভাষায় অনূদিত ও প্রচারিত হলে তিনি আন্তর্জাতিক শিল্পীর মর্যাদা লাভ করেন।
গীটার, কীবোর্ড, পিয়ানো, বেহালা’সহ সবধরণের বাদ্যযন্ত্র বাজাতেও ছিলেন পারদর্শী।
তিনি বইও লিখেছেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৪ টি।
১. আমি দিন গুনছি (কাব্য), ২. লোকমান ফকিরের গান (গানের সংকলন), ৩. জীবন যেমন (কাব্য) ও ৪. ভাবনা পারাপার।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও লোকমান ফকিরের বিচরণ ছিল। ১৯৭৮ সাল, থেকে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নির্বাহী কমিটির সাংস্কৃতিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন দীর্ঘদিন । জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস) এর প্রধান ব্যক্তি ছিলেন তিনি।
একজন সফল ব্যবসায়ী ছিলেন। গ্রুপ কোম্পানি ‘সীফস’ বাংলাদেশ লিমিটেডের সভাপতি ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। সমাজসেবা, শিক্ষাসেবা ও বিভিন্ন সামাজিক দায়িত্বও পালন করেছেন।
‘শমসের ফকির মহাবিদ্যালয়’, ‘মমতাজ ফকির উচ্চ বিদ্যালয়’ ও ‘বেগম মমতাজ ফকির বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চরাঞ্চলে শিক্ষার আলো জ্বালিয়েছেন ও নারী শিক্ষার পথ সুগম করেছেন। আর্তমানবতার সেবায় তাঁর অবদান আজও স্মরণ করে এলাকার লোকজন।
তিনি কাজের অস্বীকৃতি হিসেবে ‘চরিত্রহীন’ চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনার জন্য দেবু ভট্টাচার্যের সাথে যৌথভাবে শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক বিভাগে ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’ অর্জন করেন।
বাংলাদেশের সঙ্গীতে সার্বিক অবদানের জন্য (মরণোত্তর) সরকার কর্তৃক প্রদত্ত রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত হন।
একজন কবি, গীতিকার, সুরকার, কণ্ঠশিল্পী ও সংগীত পরিচালক; চলচ্চিত্র প্রযোজক ও পরিবেশক; একজন রাজনীতিবিদ, একজন ব্যবসায়ী, একজন সমাজসেবী ও শিক্ষানুরাগী; সর্বোপরি একজন দেশপ্রেমিক মানবতাবাদী মানুষ ছিলেন লোকমান হোসেন ফকির। তাঁর কর্মের মাঝে তিন বেঁচে থাকবেন যুগ থেকে যুগান্তরে।
