এ কে আজাদ: সাইফুল ইসলাম । কণ্ঠশিল্পী । এই প্রতিভাদীপ্ত সঙ্গীতশিল্পী পেশায় ছিলেন একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। ষাটের দশকের প্রথমভাগে রেডিওতে তাঁর দু একটি গান প্রচারিত হওয়ার পরপরই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।তাঁর কন্ঠমাধুর্যে বিমোহিত হন শ্রোতাসকল। আধুনিক গানের আভিজাত্যময় মেলোডিয়াস সুরের মূর্ছনায় বিমুগ্ধ করেন সঙ্গীতপিপাসুদের মন। সেই সময় ‘পূর্ববাংলার হেমন্ত’ হিসেবে অভিহিত করা হতো তাঁকে।
প্রতিভাবান সঙ্গীতশিল্পী সাইফুল ইসলামের মৃত্যুবার্ষিকী আজ। তিনি ২০০৩ সালের ২৩ এপ্রিল, ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৬ বছর। গুণী এই সঙ্গীতশিল্পীর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই। তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।
সাইফুল ইসলাম (ডাক নাম টুনু) ১৯৩৭ সালে ৭মার্চ, বগুড়ার এক সম্ভ্রান্ত ও শিক্ষিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মৌলভী কাবেজউদ্দিন ছিলেন বগুড়া কোর্টের একজন নামকরা আইনজীবী। বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনেতা, প্রযোজক ও পরিচালক প্রয়াত আজমল হুদা মিঠু তাঁর ছোট ভাই।
সাইফুল ইসলাম লন্ডনে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। একাধারে তিনি একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার ও নেভাল আর্কিটেক্ট। তদানিন্তন পাকিস্তানের দুই অংশের মাত্র ছয়জন নেভাল আর্কিটেক্টের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম।
কণ্ঠে আভিজাত্য ও দরদভরা সুরে রেডিওতে গাওয়া তাঁর গাওয়া ‘সোনার কাঠি রূপোর কাঠি’, ‘ইচ্ছে করে গল্প করি তোমায় নিয়ে’, ‘যদি মনে পড়ে/ফুলের দেশে খুঁজো আমার ঠিকানা’ গানগুলো সেসময়ে শ্রোতাদের হৃদয় ছুঁয়েছিল। গানগুলো বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল।
গানকে কখনোই পেশা হিসেবে নেননি তিনি। তবুও তাঁর কন্ঠশৈলী পেশাদারিত্বের সীমানা পেরিয়ে, জনপ্রিয়তার আকাশ ছুঁয়েছে।
সাইফুল ইসলাম রেডিও, টেলিভিশন ছাড়াও চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করেছেন। ‘আঁকাবাঁকা’, ‘ওরা ১১ জন’, ‘বাদশা’, ‘আপনজন’সহ বেশকিছু চলচ্চিত্রের গানে কন্ঠ দিয়েছেন।
‘বাদশা’ ছবিতে তাঁর গাওয়া ”জীবনের একি পরাজয়”, ‘আঁকাবাকা’ ছবিতে ”গল্প কথার কল্পলোকে এক যে ছিল রাজার কুমার”, ‘আপনজন’ ছবিতে ”শিল্পী আমি তো নই” এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘ওরা ১১ জন’ ছবির টাইটেল সং ‘ও আমার দেশের মাটি/তোমার পরে ঠেকাই মাথা’ এই গানগুলো সঙ্গীতপিপাসু মানুষের মন থেকে কখনো বিস্মৃত হবার নয়।
ষাট ও সত্তুর দশকে রবীন্দ্রসংগীতেরও অন্যতম প্রধান গায়ক ছিলেন তিনি। তাঁর গাওয়া একটি বিখ্যাত দেশাত্নবোধক গান আছে- ”আমি লিখতে পেরেছি বিশ্বেরসেরা মুক্তির ইতিহাস আর রক্তআঁখরে মুক্তির জয়গান”। মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে টিভিনাটক ‘একা’র টাইটেল সং ”একা বড় একা” এই জনপ্রিয় গানটিও তিনি গেয়েছেন ।
সাইফুল ইসলাম বিভিন্ন সংস্থায় দীর্ঘদিন উচ্চপদে চাকুরী করেছেন। মৃত্যুর কয়েক বছর পূর্বে বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল সংস্থা থেকে পরিচালক হিসেবে অবসর নিয়েছিলেন।
বাংলাদেশের ‘স্টিল এ্যাড মডেলিং’র পথিকৃৎ ও দেশের প্রথম মডেল রাশা ইসলাম তাঁর স্ত্রী এবং খ্যাতিমান মডেল ও অভিনেত্রী সাদিয়া ইসলাম মৌ তাঁর সুযোগ্যা কন্যা।
ষাট-সত্তুর দশকের আধুনিক বাংলা গানের জনপ্রিয় কন্ঠশিল্পী সাইফুল ইসলামের গাওয়া গানের সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম হলেও, গানগুলো কালজয়ী গান হিসেবে সোনালী সময়ের অমূল্য সম্পদ হিসেবেই বিবেচিত।
মেধাবী এই কন্ঠশিল্পীর নাম বিস্মৃতির আড়ালে নীভে গেলেও, তাঁর গাওয়া ‘তুমি সন্ধ্যাকাশের তারার মতো আমার মনে জ্বলবে’ এই গানটির মাধ্যমে তিনি চিরকালই সন্ধ্যাকাশের তারার মতো আমাদের মাঝে জ্বল জ্বল করবেন।
