শহরে বজ্রপাত কেন বেশি ঝুঁকিপূর্ণ?
শহরে উঁচু ভবনের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, আর এই ভবনগুলো অনেক সময় বজ্রপাতের জন্য ‘টার্গেট পয়েন্ট’ হিসেবে কাজ করে। কারণ আকাশ থেকে মাটির দিকে বিদ্যুৎ যখন নেমে আসে, তখন এটি সহজ পথ খোঁজে আর উঁচু ও ধাতব কাঠামো সেই পথকে সহজ করে দেয়। এয়ার কন্ডিশনার, মোবাইল টাওয়ার, লিফট সিস্টেম ও বিভিন্ন বৈদ্যুতিক স্থাপনা বজ্রপাতের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তোলে।
এছাড়া শহরে সবুজ গাছপালা কম থাকায় বজ্রপাতের শক্তি শোষণ বা ছড়িয়ে দেওয়ার স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ভারসাম্য থাকে না। কংক্রিটের রাস্তা ও ভবনের কারণে বিদ্যুৎ সহজে ছড়িয়ে না পড়ে নির্দিষ্ট জায়গায় বেশি ক্ষতি করতে পারে। ফলে শহরে বজ্রপাত তুলনামূলকভাবে বেশি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
উঁচু ভবনের ভেতরে থাকলে কী করবেন?
বজ্রপাত শুরু হলে সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা হলো পুরোপুরি বন্ধ ও শক্ত ছাদযুক্ত ঘর। তবে উঁচু ভবনের ভেতরেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা মানা না হলে ঝুঁকি থেকে যায়। বজ্রপাতের সময় জানালা বা বারান্দার কাছাকাছি না যাওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ, কারণ বাতাসের সঙ্গে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হওয়ার আশঙ্কা থাকতে পারে।
এছাড়া ধাতব বস্তু যেমন রেলিং, দরজার গ্রিল, পাইপ বা লিফটের অংশ স্পর্শ করা উচিত নয়, কারণ ধাতু বিদ্যুৎ পরিবাহক হিসেবে কাজ করে। বজ্রপাত চলাকালে টিভি, ফ্রিজ, কম্পিউটার বা এসির মতো বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহার না করাই ভালো, কারণ হঠাৎ বিদ্যুৎ প্রবাহের তারতম্যে যন্ত্র নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
বাইরে থাকলে দ্রুত করণীয়
শহরের রাস্তায় হঠাৎ বজ্রপাত শুরু হলে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয় খোঁজা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা বা হাঁটা বিপজ্জনক হতে পারে। তাই প্রথম কাজ হলো কাছাকাছি কোনো পাকা ভবনের ভেতরে ঢুকে পড়া।
উঁচু গাছ, বৈদ্যুতিক খুঁটি, ল্যাম্পপোস্ট বা বিলবোর্ডের নিচে দাঁড়ানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ এগুলো বজ্রপাত আকর্ষণ করতে পারে। ছাতা থাকলেও সেটি উঁচু করে ধরা উচিত নয়, কারণ এটি ধাতব উপাদানের কারণে ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এছাড়া ভেজা রাস্তা বা জলাবদ্ধ এলাকায় দাঁড়ানো থেকেও বিরত থাকা জরুরি, কারণ পানি বিদ্যুৎ পরিবাহিতার ঝুঁকি বাড়ায়।
মোবাইল ও প্রযুক্তি নিয়ে ভুল ধারণা
অনেকের মধ্যে একটি প্রচলিত ধারণা আছে যে মোবাইল ফোন ব্যবহার করলে বজ্রপাত আকৃষ্ট হয়, কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবে এটি সত্য নয়। তবে বজ্রপাতের সময় সমস্যা তৈরি হতে পারে মূলত বিদ্যুৎ সংযোগ বা চার্জিং অবস্থায় থাকা ডিভাইস থেকে।
তাই বজ্রপাত শুরু হলে ফোন চার্জ থেকে খুলে রাখা ভালো। ল্যাপটপ, টিভি বা অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রও সরাসরি প্লাগ থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা নিরাপদ। হেডফোন ব্যবহার করা এড়িয়ে চলা উচিত, কারণ তার বিদ্যুৎ পরিবাহিতার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এসব ছোট সতর্কতা বড় দুর্ঘটনা এড়াতে সাহায্য করে।
ঘরের ভেতরে নিরাপদ থাকার কৌশল
ঘরের ভেতরে থাকলেও বজ্রপাতের সময় কিছু বিষয় মাথায় রাখা জরুরি। জানালা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা উচিত, যাতে বাতাস বা বিদ্যুতের কোনো প্রভাব ভেতরে না আসে। ধাতব জিনিস যেমন দরজার হ্যান্ডেল বা পাইপ স্পর্শ না করাই ভালো।
সম্ভব হলে দেয়াল বা জানালার একেবারে পাশে না বসে ঘরের মাঝামাঝি স্থানে থাকা নিরাপদ। বজ্রপাতের সময় বিদ্যুৎ চলে গেলে আতঙ্কিত না হয়ে শান্ত থাকা উচিত এবং মোবাইল টর্চ বা ব্যাকআপ লাইট ব্যবহার করা যেতে পারে।
সচেতনতা সবচেয়ে বড় সুরক্ষা
বজ্রপাত প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, কিন্তু সচেতনতা দিয়ে এর ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়। আবহাওয়া পূর্বাভাস নিয়মিত দেখা, মোবাইল অ্যালার্ট ব্যবহার করা এবং ঝড়ের সময় বাইরে বের না হওয়া এসব অভ্যাস জীবন বাঁচাতে পারে। শহুরে জীবনে ব্যস্ততা যতই থাকুক, দুর্যোগের সময় কিছু মুহূর্তের সতর্কতা বড় বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে।