হেডফোন বা ইয়ারফোন ব্যবহারেও বধির হওয়া থেকে বাঁচাতে ক্লেভল্যান্ড ক্লিনিক এক প্রতিবেদনে কিছু পরামর্শ দিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এই প্রবণতা শুধু শহুরে জীবনেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং গ্রামীণ ও আধা-শহুরে এলাকাতেও স্মার্টফোন ও কম দামের ইয়ারফোন সহজলভ্য হওয়ার কারণে একই ঝুঁকি ছড়িয়ে পড়ছে।
চিরদিনের জন্য বধির হয়ে যাওয়া অভ্যাস নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। কারণ বিষয়টি এখন আর কেবল ব্যক্তিগত অভ্যাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি জনস্বাস্থ্যগত উদ্বেগে রূপ নিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ৬ থেকে ১৯ বছর বয়সী প্রায় প্রতি ৮ জনের মধ্যে ১ জন ইতোমধ্যেই শব্দজনিত শ্রবণ সমস্যায় ভুগছে। এদের একটি বড় অংশই দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ ভলিউমে হেডফোন ব্যবহার করে থাকে। দিনে কয়েক ঘণ্টা ধরে এর ব্যবহারের প্রবণতা থাকা বেশ খারাপ।
কানের ক্ষতি হয় যেভাবে
অডিও বিশেষজ্ঞ ভ্যালেরি পাভলোভিচ রাফ জানান, মানুষের শ্রবণশক্তি নির্ভর করে কানের ভেতরের অত্যন্ত সূক্ষ্ম একটি অংশ—ককলিয়ার ওপর। এর গড়ন সাপের মতো। যেখানে তরল ও ক্ষুদ্র চুলের মতো কোষ থাকে।
এই কোষগুলোই শব্দ তরঙ্গকে বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তর করে মস্তিষ্কে পৌঁছে দেয়ার ফলে আমরা সেটিকে শব্দ হিসেবে অনুভব করি। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন এই সূক্ষ্ম কোষগুলোর ওপর অতিরিক্ত শব্দচাপ পড়ে।
তিনি ব্যাখ্যা করেন করে বলেন, দীর্ঘ সময় উচ্চ শব্দে গান শোনা বা ক্রমাগত হেডফোন ব্যবহারের ফলে এই কোষগুলো ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই কোষ একবার নষ্ট হয়ে গেলে তা আর পুনরুদ্ধার হয় না।
ফলে নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সির শব্দ স্থায়ীভাবে শোনার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। যেহেতু এটি অনেক সময় দেরিতে বোঝা যায় তাই অনেকেই অবহেলা করে।
বধির হওয়ার প্রাথমিক লক্ষণ
সাধারণত হঠাৎ করে এই শ্রবণহানি ঘটে না। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। ধীরে ধীরে বোঝা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—মানুষের কথা স্পষ্টভাবে না শোনা, বিশেষ করে ভিড়ের মধ্যে কথা বুঝতে সমস্যা হওয়া; উচ্চ স্বরের শব্দ যেমন পাখির মিহি ডাক বা সূক্ষ্ম শব্দ শুনতে অসুবিধা;
এবং কানে ক্রমাগত ভোঁ ভোঁ বা ঘণ্টাধ্বনি শুনতে পায়। এটি টিনিটাস নামেও পরিচিত।
এই লক্ষণগুলো অনেক সময় সাধারণ ক্লান্তি বা মনোযোগের অভাব বলে ভুল বোঝেন অনেকে। ফলে অবহেলায় সমস্যাটি গভীর ক্ষতি করতে থাকে।
কতটা শব্দ বিপজ্জনক
শব্দের তীব্রতা পরিমাপ করা হয় ডেসিবেল এককে। এটি একটি লগারিদমিক স্কেল অর্থাৎ সামান্য বাড়লেও কানের প্রভাব বহুগুণ বেড়ে যায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ৮০ ডেসিবেল পর্যন্ত শব্দ নিরাপদ ধরা হয়, যদি তা দিনে ৮ ঘণ্টার মধ্যে সীমিত থাকে। কিন্তু এর বেশি সময় বা বেশি তীব্রতায় থাকলে ঝুঁকি দ্রুত বাড়ে।
স্মার্টফোন বা ট্যাবলেটের সর্বোচ্চ ভলিউম হেডফোনে ১১০ ডেসিবেল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা মাত্র কয়েক মিনিটেই কানের ক্ষতি করতে সক্ষম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আশপাশের কেউ হেডফোনের শব্দ শুনতে পেলে বুঝতে হবে সেটি ইতোমধ্যেই বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছে গেছে।
কিভাবে কান সুস্থ রাখবেন
হেডফোন বা ইয়ারফোন ব্যবহারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এর ক্ষতি খালি চোখে দেখা যায় না। এটি কোনো ব্যথা দেয় না। তাৎক্ষণিক ক্ষতিও বোঝা যায় না। ফলে ব্যবহারকারীরা ঝুঁকির মধ্যে থেকেও স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার চালিয়ে যান।
অডিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড়দের তো বটেই বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি বেশি। কারণ তাদের শ্রবণব্যবস্থা এখনো পূর্ণ পরিপক্ব নয় এবং তারা তুলনামূলকভাবে বেশি সময় অডিও ডিভাইসের ওপর নির্ভরশীল।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সমস্যার সমাধান প্রযুক্তি বন্ধ করা নয় বরং ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনা।
এ জন্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কম ভলিউমে দীর্ঘ সময় শোনার বদলে মাঝারি ভলিউমে সীমিত সময় শোনা নিরাপদ।
অনেক বিশেষজ্ঞ সর্বোচ্চ ভলিউমের ৫০-৬০ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখার পরামর্শ দেন।
এ ছাড়া ভালো ফিটিং ইয়ারফোন বা নয়েজ-ক্যানসেলিং ডিভাইস ব্যবহার করলে বাইরের শব্দ কম প্রবেশ করে। ফলে ভলিউম বাড়ানোর প্রয়োজন পড়ে না। এতে কানে শব্দচাপ কম পড়ে। তবে এই ধরনের ডিভাইস ব্যবহারের ফলে আশেপাশের পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ শব্দ যেমন যানবাহনের হর্ন বা সতর্ক সংকেত শোনা যায় না ফলে ভয়ানক বিপদ ঘটতে পারে। তাই সতর্কতাও জরুরি।
কিছু আধুনিক ডিভাইসে এখন ভলিউম লিমিটিং প্রযুক্তি যুক্ত করা হচ্ছে, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শব্দকে নিরাপদ সীমার মধ্যে রাখে। সেসব সুবিধা আছে এমন ইয়ারফোন বা হেডফোন ব্যবহার করা ভালো।
দীর্ঘমেয়াদি সতর্কতা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শ্রবণশক্তি একবার হারালে তা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তাই শিশু-কিশোরসহ সবার মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
অডিও বিশেষজ্ঞ ভ্যালেরি পাভলোভিচ রাফের ভাষায়, ‘মানুষ জীবনে একবারই শ্রবণশক্তি পায়। সেটি রক্ষা করতে হলে এখন থেকেই শব্দ ব্যবহারে সংযম জরুরি।’
তাই ডিজিটাল যুগে শব্দের ভেতরে হারিয়ে না গিয়ে শব্দকে নিয়ন্ত্রণে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ। এ জন্য সচেতনতা ও অভ্যাসই একমাত্র প্রতিরক্ষা।
